কবির বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নৃত্য

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় কবির বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নৃত্য

কবির বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নৃত্য

 

কবির বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নৃত্য

কবির বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নৃত্য

নৃত্য সম্বন্ধে যে উৎসাহ ১৯২৪ সালের পর থেকে পরিলক্ষিত হয় তার পেছনে কবির বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার এক বড় ভূমিকা রয়েছে। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর ইউরোপ এবং আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের পরিচিতি বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে তিনি পর পর কয়েকবারই ইউরোপ এবং আমেরিকায় ভ্রমণে যান। এসব বিদেশ ভ্রমণে তার সম্মানার্থে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করেছেন।

রবি জীবনীকার প্রভাত কুমার পাল রবি জীবনীতে সে কথা জানিয়েছেন। বিদেশে দর্শকদের সম্মুখে বাংলা ভাষার গান এবং তার ভাবার্থ অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি হয়তো উপলব্ধি করেছিলেন যে, সঙ্গীতের ভাষার চাইতে চিত্রকলা এবং দেহের ভাষা বা নৃত্যের ভাষা অধিকতর বিশ্বজনীন। যে কারণে শেষ বয়সে কবি হাতে তুলে নিলেন রংতুলি। ঠিক একই কারণ তাকে নৃত্যের কথা ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

শিল্প সম্মত দেহের ভাষা অর্থাৎ নৃত্যের আবেদন তুলনামুলকভাবে সহজ ও সুদূরপ্রসারী একথা সম্ভবত: ইউরোপ ভ্রমণের সময়ই তার মনে আসে। ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত কবি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং জাপান, চীন ভ্রমণ করেন। জাপানে কবির মনে নৃত্য সম্বন্ধে যে নিবিড় আগ্রহ ও অনুরাগ জন্মেছিল তার পরিচয় পাওয়া যায় জাপানী যাত্রী গ্রন্থের বিভিন্ন উল্লেখ থেকে।

এই সব উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় কবি নৃত্য সম্বন্ধে নতুন করে ভাবছিলেন। তার চেতনাকে আচ্ছন্ন করে আছে ছন্দোময়তার চিন্তা। জাপানে তিনি যে নৃত্যাভিনয় দেখেছেন তা তিনি স্বীকার করেছেন। অনুমান করা যায় নৃত্যাভিনয় বলতে তিনি নো ও কারুকীর নৃত্যভিনয়ের কথাই বলেছেন।

জাপানী নৃত্যাভিনয় সম্বন্ধে কবি এক জায়গায় বলেছেন, জাপানের কিয়োটোতে ঐতিহাসিক নাটোর অভিনয় দেখেছি; তাতে কথা আছে বটে কিন্তু তার ভাবভঙ্গি, চলাফেরা সমস্ত নাচের ধরণে। বড় আশ্চর্য তার শক্তি। ‘নো’ নৃত্যাভিনয়ের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ধীরগতি এবং নির্দিষ্ট ভঙ্গি। আমাদের কথাকলি নাচের মতো মূদ্রার ব্যবহার যদিও সেই তবুও সংকেত ধর্মিতা এতে লক্ষ্য করা যায়। যেমন, কয়েকটি মাত্র পদক্ষেপ যাত্রা শেষ নির্দেশ করে।

হাঁটুতে আঘাত করলে উত্তেজনা প্রকাশ পায় ইত্যাদি। এতে মুখোশের ব্যবহার হয়। দুজন প্রধান অভিনেতার মধ্যে একজন মুখোশ পরে। বারেবারে মুখোশ বদল করে সে বিভিন্ন চরিত্রে অবতীর্ণ হয়। এ পরজন দর্শকের মতো তার গতিবিধি লক্ষ্য করে। সবটুকুর মধ্যে একটা ঘরোয়া অথচ আভিজাত্যের ভাব ফুটে ওঠে। ‘কাবুকী’, ‘নো’ এরই আরেক পরিণতি । নো এর মতো কারুকীতেও সঙ্গীত, নৃত্য ও নাটকের ব্যবহার হয়।

 

কবির বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নৃত্য

 

কারুকীতে মুখোশের ব্যবহার হয় না। তবে অভিনেতারা সারা মুখে বিচিত্র রং ও রেখা দিয়ে মুখোশের অনুকরণ করে। অনেকটা কথাকলি নৃত্যপদ্ধতির মতো। পিকিং এর নাট্যশালায় নৃত্যাভিনয় দেখেও কবির ভালো লেগেছিল। জাপান চীন ভ্রমণের স্মৃতি ম্লান না হতেই ১৯২৭ সালের জুলাই আগষ্ট মাসে জাভা বালি দ্বীপ ভ্রমণে যান কবি। এই ভ্রমণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া নৃত্যানুরাগ। জাভা যাত্রীর পত্র’ গ্রন্থে এই বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে।

কবি লক্ষ্য করেছেন জাভা ও বালি দ্বীপের সঙ্গে ভারতের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রয়েছে। সেখানকার নাট্যাভিনয়ে রামায়ণ ও মহাভারতের বিশেষ স্থান রয়েছে। নৃত্য এদের জীবনের সঙ্গে কতখানি জড়িত তা কবির একটি উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায়।

“কাল যে ছবির অভিনয় দেখা গেল, তাও প্রধানত নাচ অর্থাৎ ছন্দোময় গতির ভাষা দিয়ে কথা বলা…। এদেশে নাচের মনোহারিকা ভোগ করার জন্যই নাচ নয়, নাচটা এদের ভাষা।… এদের গামেলানোর সঙ্গীতটাও সুরের নাচ।… এই সঙ্গীতটাও সঙ্গীতের জন্য
নয় কোন একটা কাহিনীকে নৃত্যছন্দের অনুষঙ্গ দেবার জন্য। জাভা ও বালি দ্বীপের নৃত্যনাট্য প্রায় কথাকলির মতো।

জাপান ভ্রমণের অনুরূপ জাভা বালি দ্বীপে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কবির নৃত্যচেতনাকে আরো গভীর ও ব্যাপকতর করেছে। ১৯৩০ সালে কবি ইউরোপ ভ্রমণে যান। ইংল্যান্ডে থাকার সময় ভার্টিংটন হলে তিনি ব্যালে নৃত্য দর্শন করেন। ব্যালের রচনা কৌশলও দেখেছেন। রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী ব্যালে নৃত্য পরিচালনা, প্রতিদিনের ব্যালে রচনারকরণ কৌশলে অনুশীলন করেন।

জাপান ও জাভা ভ্রমণের পর এই ইউরোপ ভ্রমণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এরপরেই কবি প্রত্যক্ষভাবে নৃত্যনাট্যের সূচনা করেছিলেন শিশুতীর্থ ও শাপমোচন রচনার মাধ্যমে। শিশুতীর্থ ও শাপমোচনকে সেই অর্থে পূর্ণাঙ্গ নৃত্যনাট্য না বলে নৃত্যনাট্যের সূচনা বলা হয়। কবি জাডা, বালি প্রভৃতি দ্বীপ- পরিদর্শন করেন।

সেখানে ঐসব দেশবাসীর নাচ দেখে কবি মুগ্ধ ও চমৎকৃত হন। রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতির এক একটি ঘটনা কেবল নাচের দ্বারাই যে ব্যক্ত করা যায়, কবি তা সেই প্রথম দেখলেন।

“এদেশ উৎসবের প্রধান অঙ্গ নাচ।… এক-একটি জাতির আত্মপ্রকাশের এক-একটি বিশেষ পথ থাকে। বাংলাদেশের হৃদয় যেদিন আন্দোলিত হয়েছিল সেদিন সহজেই কীর্তনগানে সে আপন আবেগসঞ্চারের পথ পেয়েছি; এখনও সেটা সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়নি। এখানে এদের প্রাণ যখন কথা কইতে চায় তখন সে নাচিয়ে তোলে। মেয়ে নাচে পুরুষ নাচে।

এখানকার যাত্রাভিনয় দেখেছি, তার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত চলায় ফেরায়, যুদ্ধে-বিগ্রহে, ভালোবাসার প্রকাশে, এমন কি ভীড়ামিতে, সমস্তটাই নাচ।… সেদিন এখানকার এক রাজবাড়ীতে নাচ দেখছিলুম।… এই নাচ-অভিনয়ের বিষয়বস্তুটা হচ্ছেঠ শাস্ত্র-সত্যবতীর আখ্যান। এ থেকে বোঝা যায়, কেবল ভাবের আবেগ নয়, ঘটনা বর্ণনাকেও এরা নাচের আকারে গড়ে তোলে… আমাদের দেশে একদিন নাট্য- অভিনয়ের সর্বপ্রধান অঙ্গই ছিল নাচ।

 

কবির বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নৃত্য

 

নাটক দেখতে যারা আসে, পশ্চিম মহাদেশ তাদের বলে অভিয়েনস, অর্থাৎ শ্রোতা। কিন্তু ভারতবর্ষে নাটককে বলেছে দৃশ্যকাব্য; অর্থাৎ, তাতে কাব্যকে আশ্রয় করে চোখে দেখার রস দেবার জন্যই অভিনয়। “… (জাভাযাত্রীর পত্র, পৃ: ২৫৪)।

আরও দেখুন :

Leave a Comment