রবীন্দ্রনাটকের গান ব্যবহারের কারণ

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় রবীন্দ্রনাটকের গান ব্যবহারের কারণ। রবীন্দ্রসমকাল পর্যন্ত বাংলা নাটকে গানের ভূমিকা আর রবীন্দ্রনাট্যে গীতিযোজনার প্রসঙ্গ বিচারের যোগ্য। উৎস হিসেবে এই দুই এর মূলে আছে মাত্রার চিহ্ন কিন্তু দুই এর অর্থই অত্যন্ত পৃথক। অন্য নাটকে গান যেন অনেকটা অগত্যা প্রয়োগ কিন্তু রবীন্দ্রনাটকে গানের ব্যবহার আমাদের কাছে ভিন্ন ধরনের এক পরিকল্পনার আভাস নিয়ে আসে।

রবীন্দ্রনাটকের গান ব্যবহারের কারণ

 

রবীন্দ্রনাটকের গান ব্যবহারের কারণ

যার বাস্তব আভাস পাই তাঁর ‘শারোদৎসব’ সহ পরবর্তীকালীন রচনাসমূহে। সেই সময় রচিত নাটকগুলিতে যেমন চোখে পড়ে সংগীতের বহুল প্রয়োগের প্রবনতা তেমনি চোখে পড়ে একটি নতুন আঙ্গিকের বিন্যাস। এই বিন্যাসে যাত্রার প্রভাব তার ভাবনার অনেকখানি জুড়ে ছিল। ‘রঙ্গমঞ্চ’ পর্বদুটি লক্ষ করলে এই বিষয়টি খানিক অনুমান করা যেতে পারে।

রবীন্দ্রনাথের নাটক যাত্রার সঙ্গে প্রতিরোধী সম্পর্কে যুক্ত কিন্তু তিনি তাকে গ্রহন করেন অনুকূল আদর্শ হিসেবে। যাত্রার অভিনয়ে দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে এর গুরুত্বের ব্যবধান নেই। এ কথা তিনি ব্যক্ত করেন ১৩০৯ সালে এবং তারই ফলে ‘ভাবুকের চিত্তের মধ্যে রঙ্গমঞ্চ আছে তার কথা মনে রেখেই তিনি উৎসাহী হন পবরবর্তী নাট্য রচনায়।

মঞ্চ ও দৃশ্যের পরিকল্পনায় যাত্রার সময় পরিবর্তীর্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে ঐ একই অভিপ্রায়ে তাঁর নাটকে যুক্ত করেণ গান । নিখে রবীন্দ্রনাথের নাটকে গান ব্যবহারের কারণ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

রবীন্দ্রনাটকে গান ব্যবহারের কারণ সম্বন্ধে গভীর তথ্য ও তত্ত্বনিষ্ঠ আলোচনা রয়েছে। কবি কখনও গানের ব্যবহার করেছেন নাট্যোৎকণ্ঠার অস্বস্তির মধ্যে দর্শক মনের স্বস্তি বিধানের জন্য। যেমন ‘রাজা ও রানী’ নাটকে প্রথম সৈনিকের গান ‘ওই আঁখি রে’ এরুপ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সংযুক্ত হয়েছিল। কখনও সেখানে জনপ্রমোদের ভাবনাও কাজ করেছে।

বুঝিয়ে দেওয়ার চাইতে দর্শকমনকে গানের প্লাবনে ভাসিয়ে দিতেই যেন চেয়েছেন ক’রবীন্দ্রনাথঠাকুর কখনও অভিনেতা অভিনেত্রীর গাইবার ক্ষমতার উপর নির্ভও করেছে নাটকের গানের সংখ্যা। যেমন ‘রাজা’ নাটকে গুরুদেব ঠাকুরদার ভূমিকা গ্রহন করেন। তখনও তাঁর গাইবার ক্ষমতা ছিল, তাই বহুগান তাঁকেই গাইতে হয়।

বাউল, পাগল, বালকদল সৃষ্টি করে অনেক গান তাদের দিয়েও গাওয়ানো হয়। এই চরিত্রগুলোর রচনার উদ্দেশ্য ছিল সকল গান জানা এবং গাইয়ে ছাত্র ও কর্মীদের নাটকের মধ্যে টেনে আনা। এই সকল বিষয় বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, রবীন্দ্রনাটকের গানের ব্যবহার শুধু আভ্যন্তরীন দাবীতে নয়, অনেক সময় তা হয়েছে একেবারে বহিরঙ্গ কারনেও।

শান্তি নিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ কখনও কখনও নাটকের তার গান ব্যবহার করেছেন তাঁর শিক্ষাদর্শের প্রেরণায়। শান্তিনিকেতনের বাইরের পরিবেশ যেমন নিজের অজান্তেই ছাত্রদের মনকে তৈরী করে তুলতো তেমনি গানও জীবনকে সুন্দর করে তুলবার একটি প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করতো।

“শান্তিনিকেতনের বাইওে প্রান্তরশ্রী যেমন অগোচরে ছেলেদের মনকে তৈরী করে তোলে তেমনি গান ও জীবনকে সুন্দর করে তুলবার একটি প্রধান উপাদান। এতে করে ওদের জীবনের একটি বড় জানালা খুলে দেওয়া হচ্ছে।’

‘শারোদৎসব’ ঋতুনাট্যে গান ও প্রকৃতির মিলনে খুঁজে পাওয়া যায় বিকাশোন্মুখ মনের জানালা। রবীন্দ্রনাটকের সাথে গানের সম্পর্কের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ধুর্জটি প্রসাদ রবীন্দ্র প্রতিভার একটি বৈশিষ্টের কথা ইঙ্গিত করে লিখেছেন-

There is a deeper connection between Tagore the composer and Tagore the dramatist then what appears on the surface. Poetry certainly, but it is not poetry merely. Tagore’s musical composition can not but help the drama because of the very nature office genius.”

কবি প্রতিভার সঙ্গীতধর্মী ও গীতিধর্মী প্রবনতাই তার নাটকগুলোকে ক্রমশ গীতিময় করে তুলেছে এবং গান হয়ে উঠেছে তার নাটকের অপরিহার্য অঙ্গ। আলোচনার সুবিধার জন্য নাটকের প্রকৃতি অনুসারে সমগ্র নাট্য সাহিত্যকে নি লিখিত – ভাবে ভাগ করে নেয়া হলো।

 

Google news
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

 

প্রকাশ সময়ের পারস্পর্য অপেক্ষা অন্তঃপ্রকৃতি ও বহিঃপ্রকৃতির ঐক্য শ্রেণীবিভাগে সহায়তা করে বলে মনে হয়। সেখানেই এক এক শ্রেনীর নাটকের রুপবস্তু ও রসবস্ত্র সম্বন্ধে ধারণা পরিস্ফুট হয়ে উঠা সম্ভব হয়-

গীতিনাট্য (সংগীতপ্রধান)

  • বাল্মীকি প্রতিভা (কালমৃগয়া)
  • মায়ার খেলা (নলিনী)

কাব্যনাট্য (কাব্যপ্রধান)

  • চিত্রাঙ্গদা
  • বিদায়-অভিশাপ
  • গান্ধারীর আবেদন
  • সতী
  • নরকবাস
  • কর্ণকুন্তীসংবাদ
  • লক্ষ্মীর পরীক্ষা

রোমান্টিক ট্রাজেডি (কাব্য ও নাটকের সমন্বয়)

  • রাজা ও রাণী (তপতী)
  • বিসর্জন মালিনী

রূপক সাংকেতিক নাটক (ভাব বা তত্ত্বপ্রধান)

  • প্রকৃতির প্রতিশোধ
  • শারদোৎসব (ঋণশোধ )
  • রাজা (অরূপ-রতন)
  • অচলায়তন (গুরু)
  • ডাকঘর
  • ফাল্গুনী
  • মুক্তধারা
  • রক্তকরবী
  • কালের যাত্রা
  • তাসের দেশ

নৃত্যনাট্য (নৃত্য প্রধান)

  • চিত্রাঙ্গদা
  • চন্ডালিকা
  • শ্যামা
  • নটীর পূজা
  • শাপমোচন

রাজা’ নাটকের ঠাকুরদা বলে, ‘আজ সমস্ত রাস্তাই গানে ভাসিয়ে দিয়ে চলব’, ‘আজ আমাদের নানা-সুরের উৎসব। সেই উৎসব পরিবেশেই সুদর্শনা আধার ঘরের রাজাকে দেখার অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করে। তাই সুদর্শনা বলে ‘ওই যে আম্রবনের বীথিকার ভিতর দিয়ে উৎসব- বালকেরা আজ গান গেয়ে যাচ্ছে, ডাক ডাক্ ওদের ডেকে নিয়ে আয় একটু গান শুনি।’ গান থেকে সুদর্শনা পেয়ে যায় চোখে দেখা, কানে শোনা ঘুচিয়ে দেবার শিক্ষা ।

‘অচলায়তন’ নাটকের আরম্ভেই পঞ্চকের গান শুনে মহাপঞ্চক ক্ষেপে গিয়ে বলে, আবার গান!’ ‘গান! চতুর্দিকব্যাপী জড়তার মধ্যে বাস করে অথচ পঞ্চক অনুভব করে ‘আকাশটা যেন গান গেয়ে উঠেছে… আমার সমস্ত শরীরটা গুন গুন করে বেড়াচ্ছে।’
‘ফাল্গুনী’ নাটকে ‘গানের চাবি দিয়েই এর এক একটি অঙ্কের দরজা খোলা হয়েছে।

 

রবীন্দ্রনাটকের গান ব্যবহারের কারণ

 

‘মুক্তধারা’-য় যন্ত্ররাজ বিভূতির বিরুদ্ধতা করে, প্রতিবাদ করে ধনঞ্জয় গান গেয়ে। ‘রক্তকরবী’- নাটকে জালবন্দী রাজার আছে মাটির তলায় চাপাপড়া মরা ধন। বন্দী রাজা গান শুনতে ভয় পায়। বিপরীত দিকে রঞ্জন রাস্তা দিয়ে চলে গান গেয়ে। একদিকে মৃত ঐশ্বর্যের পিন্ড, অন্যদিকে সপ্রাণ ফসল- পৌষের গান। ফসল পেকেছে, কাটতে হবে, তারি ডাক।’

আরও দেখুন :

Leave a Comment