প্রচলিত আনদ্ধ যন্ত্র তবলা

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় প্রচলিত আনদ্ধ যন্ত্র তবলা। বর্তমান যুগে উচ্চাঙ্গ সংগীত ও লঘু সংগীত, কন্ঠ সংগীত এবং যন্ত্র সংগীত যে কোন ধরণের সংগীতের সাথে সবচেয়ে প্রচলিত এবং জনপ্রিয় তাল যন্ত্র হচ্ছে তবলা বাঁয়া। তবলা-বাঁয়া একে অপরের জুটি। দু’টিতে মিলে তৈরি হয়েছে একটি সম্পূর্ণ বাদাযজ্ঞ।

প্রচলিত আনদ্ধ যন্ত্র তবলা

 

তবলা

 

তবলা নামের উৎপত্তি আরবী শব্দ তবল থেকে। তাই সাধারণভাবে ধারণা প্রচলিত আছে যে, এই বাদ্যযন্ত্রের উৎপত্তির পেছনে কোন আরব বাদ্যযন্ত্রের প্রভাব রয়েছে।

উপমহাদেশে আরবদের আগমণের আরো অনেক আগে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতাব্দীর ভাস্কর্যে তবলা জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের ছবি দেখা যায়। যদিও তবলা নামটি তখন প্রচলিত ছিলো না। তবলা জাতীয় যে বাদ্যযন্ত্রের চিত্র প্রাচীন গুহাচিত্রে দেখা যায় তার নাম ছিলো পুষ্কর। গঠনগত দিক থেকে এবং বাজাবার ধরণের দিক থেকে তবলা বাঁয়ার সাথে এর মিল খুব বেশি। প্রাচীন পুষ্কর থেকে ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে তবলা বাঁয়ার উৎপত্তি হয়েছে।

স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ তাঁর ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস গ্রন্থে পুষ্কর প্রসঙ্গে বলেছেন যে এটি মৃদঙ্গ জাতীয় বাদ্যযন্ত্র। আধুনিক যুগে গানের সাথে যেমন তবলা বাঁয়া ব্যবহার করা হয় প্রাচীন কালে এদেশে তেমনি মৃদঙ্গ ধরণের তিনটি যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। এর মধ্যে দু’টির আকার বড়, এ দু’টি এক সমান। অন্যটি আকারে ছোট। এই বাদ্যযন্ত্রগুলোকে পুষ্কর বলা হতো। পুষ্কর যন্ত্রের বিবরণ স্বামী প্রজ্ঞানানন্দর ভাষায় দেওয়া হলো-

“বড়ো পুষ্কর দুটি সোজাভাবে দাঁড় করানো আর ছোটটি শোয়ানো (শায়িত অবস্থায়) থাকত। পাথরের গায়ে খোদাই করা ভাস্কর্যচিত্রে কখনো কখনো দু’টি পুষ্করের প্রতিকৃতি দেখা যায়। প্রাচীনকালে তিনটি পুষ্করের মধ্যে বড় দু’টির একটিকে বাম হাতে ও অপরটিকে ডানহাতে এবং ছোটটিকে সম্ভবতঃ উভয় হাত দিয়ে বাজানো হোত।

তবলা

খৃষ্টীয় ৬ষ্ঠ-৭ম শতাব্দীতে ভূবনেশ্বরের যুক্তেশ্বর মন্দিরে, খৃষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে বোম্বাইয়ের বাদামী মন্দিরে ও তাছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরগুলিতে তিনটি পুষ্করের প্রস্তরচিত্র দেখা যায়। …. নটরাজের দক্ষিণে নৃত্যশীল গনপতি। গণপতির পাশে একজন বাদক দু’হাতে দু’টি সমান আকারের পুষ্কর বাজাচ্ছে। তার সামনে আর একটি সামান্য ছোট আকারের ছোট মৃদঙ্গ শোয়ানো আছে।”

তিনটি পুষ্করের মধ্যে যেগুলো খাড়াভাবে রেখে বাজানো হতো সেগুলো ছিলো তবলা বাঁয়ার আদি রূপ। যদিও তবলা নামের কোন বাদ্যযন্ত্র সে আমলে ছিলো না। প্রকৃতপক্ষে তবলা নামের কোন বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় চতুর্দশ শতাব্দীতে। তবলা শব্দটির উৎপত্তি আরবি শব্দ তবল থেকে। আরব দেশে তবল বলতে সমতল উপরিভাগ বিশিষ্ট তালযন্ত্রকে বোঝানো হতো। এই সমতল অংশটা হতো উর্দ্ধমুখী।

উপমহাদেশে আরবদের আগমণের পূর্বে দুন্দুভি, ভেরী, নিশান প্রভৃতি তালযন্ত্রের প্রচলন ছিলো। ঐতিহাসিকদের মতে মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে রণবাদ্য হিসেবে তরল এবং আরো কয়েকটি তালযন্ত্রে এদেশে আসে। যেহেতু আরবদের উর্দ্ধমুখী তালযন্ত্রের নাম ছিলো তবল, সেইহেতু তারা এদেশে প্রচলিত তালযন্ত্রকে একই নামে অভিহিত করল।

তবে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, তাদের তরল যন্ত্রের সাথে হিন্দুস্তানী সংগীতে প্রচলিত তালযন্ত্রের কোন মিল ছিলো না। এছাড়া আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়, চতুৰ্দশ শতাব্দীর সূচনাকালের পূর্বে এদেশে তবল নামে কোন বাদ্যযন্ত্রের নামের উল্লেখ পাওয়া যায় না। পাখওয়াজ কেটে তবলা তৈরি করা হয়েছে, এ ধরণের একটি ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। তবে এর স্বপক্ষে কোন লিখিত প্রমাণ নাই।

 

তবলা

 

এছাড়া ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে সময় থেকে পাখোয়াজের প্রচলন সে সময়ে তবলাও প্রচলিত ছিলো। একটি থেকে অপরটির উৎপত্তি হলে একটি অপরটি অপেক্ষা প্রাচীনতর হবে। কিন্তু তবলার ক্ষেত্রে সে কথা বলা যায় না। কাজেই যুক্তি তর্কের ভিত্তিতেও বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করা যায় না।  পুষ্কর যন্ত্র ছিলো তিনটি তাল যন্ত্রের সমাহার। তিনটিকে একত্রে ত্রিপুস্কর বলা হতো।

ত্রিপুষ্করের মধ্যে দু’টি বাদকের সামনে খাড়া করে অর্থাৎ উর্দ্ধমুখী অবস্থানে রাখা হতো। তৃতীয়টি আড়াআড়িভাবে বাদকের কোলে রাখা হতো। এগুলোর আকার ছিলো অনেকটা মৃদঙ্গের মতো। পরবর্তী সময়ে কোলে রাখা বাদ্যযন্ত্রটির গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক পর্যায়ে এর পরিমার্জিত রূপ হিন্দুস্তানী সংগীতের জগতে প্রধাণ তালযন্ত্র হিসেবে পরিগণিত হয়। উত্তর ভারতে এটি পাখোয়াজের রূপ লাভ করে এবং দক্ষিণ ভারতে এটি মৃদঙ্গমের রূপ লাভ করে।

ত্রিপুষ্করের মধ্যে বাকী দু’টি পুষ্করের গুরুত্ব এ সময়ে কমে আসে এবং রীতিমত অবহেলিত হয়ে পড়ে। কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত আঞ্চলিক এবং লোক সংগীতের সহযোগী হিসেবে খাড়া করে বাজানোর এ সকল তালযন্ত্র প্রচলিত থাকে। কালের বিবর্তনে আবার এক পর্যায়ে এসে এই বাদ্যযন্ত্রগুলোর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ক্রমান্বয়ে এগুলো অভিজাত সংগীতের উপযোগী রূপ লাভ করে এবং তবলা বাঁয়া রূপে উচ্চাঙ্গ সংগীতের আসরে স্থান করে নেয়।

 

তবলা

 

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত তবলা বাঁয়া সাধারণ বা লঘু সংগীতের সহযোগী হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে উচ্চাঙ্গ সংগীতের জগতে গ্রুপদের জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা কমে আসতে থাকে এবং তার পরিবর্তে খেয়ালের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। খেয়ালের সঙ্গে সহযোগী সুর যন্ত্র হিসেবে যেমন বীণ এবং রবাব বাজানো হতো, তেমনি তাল যন্ত্র হিসেবে পাখওয়াজ বাজানো হতো।

খেয়ালের সঙ্গে পাখওয়াজ খুব একটা মানানসই ছিলো না। খেয়ালের সাথে এমন ধরণের তাল যন্ত্র প্রয়োজন হয়ে পড়ল যাতে করে পাখওয়াজের মত উচ্চাঙ্গের কিছু কাজ যেমন দেখানো যায়, তেমনই হালকা ধরণের কিছু কাজও যেন দেখানো যায়। এক্ষেত্রে তবলা এবং বাঁয়া ছিলো সবচেয়ে মানানসই। কাজেই যুগের দাবী অনুযায়ী আধুনিক যুগের উচ্চাঙ্গ সংগীতের সাথে তবলা এবং বাঁয়া সহযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো।

ক্রমে শুধু সহযোগী যন্ত্র নয়, একক বাদন অর্থাৎ তবলা লহরা বাজানোর প্রথাও খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে। খেয়ালের সাথে তবলা যন্ত্রের উত্তরণের সম্পর্ক আছে, সে কারণে অষ্টাদশ শতাব্দীতে সম্রাট মুহম্মদ শাহ রঙ্গিলের শাসনামল এই যন্ত্রের উৎকর্ষের সময়। এ সময় থেকেই তবলার বিভিন্ন ধরনের বাজ বিকাশ লাভ করতে থাকে।

সাধারণত ডান হাতে তবলা আর বাঁ হাতে বাঁয়া বাজানো হয়ে থাকে। সেজন্য তবলাকে অনেক সময় ‘ভাহিনা’ বা ‘ডাইনা’ বলা হয়ে থাকে। এটি কাঠের তৈরি। আকারে বাঁয়ার চেয়ে কিছুটা ছোট। তবলা আম, কাঁঠাল, নিম বা এ জাতীয় কাঠের তৈরি হয়ে থাকে। প্রথমে চোঙার আকৃতির এক টুকরা কাঠ নেওয়া হয়, এর নিচের দিক খানিকটা মোটা আর ওপরের দিক কিছুটা সরু।

এই কাঠকে খুদে এর ভেতরে প্রায় অর্ধেকটা অংশ ফাঁপা করে ফেলা হয়। এর ওপরে গরু বা ছাগলের চামড়ার ছাউনি লাগানো হয়। চামড়া লাগাবার কিছু কৌশল আছে। প্রথমে তবলার মুখের ব্যাসের চেয়ে সামান্য বড় এক টুকরা চামড়া বসানো হয়। এর উপরে আরেক টুকরা বসানো হয়, এই দ্বিতীয়টি অনেকটা রিঙের মত, অর্থাৎ এর চারপাশের ব্যাস আছে কিন্তু মধ্যখান গোল করে কাটা।

প্রথমটার ওপরে দ্বিতীয়টা একসাথে তবলার ফাঁপা মুখের ওপর বসিয়ে তার ওপর তবলার মুখ ঘিরে বৃত্তাকারে পাকানো বিনুনি বাঁধা হয়। বাঁধার সময় খেয়াল রাখা হয় ছাউনি যেন টান টান থাকে। এই টান টান ভাব বজায় রাখবার জন্য চামড়ার তৈরি লম্বা এক ফিতে নেওয়া হয়। একে দোয়ালী বা ছোট্ট বলা হয়।

Google news
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

তবলার ওপরের অংশে বিনুনির ভেতরে একবার এবং তবলার একেবার নিচে রিঙের মত গোল করে লাগানো আরেকটা ছোটে একবার, এভাবে বারবার অতিক্রম করানো হয়, এর ফলে এটি তবলার চারপাশ ঘুরে আসে। তবলার সুর কতখানি উঁচু বা নিচু হবে তা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে ছাউনির টানটান ভাব । ছাউনির টান কম হলে সুর নিচু হয়, বেশী হলে সুর উঁচু হয়।

এই টানকে নিয়ন্ত্রণ করবার জন্য দোয়ালির সঙ্গে আটটি কাঠের গুটি আটকানো থাকে। প্রয়োজন মত এই গুটি গুলোকে ওপরে বা নিচে নামিয়ে তবলার সুর উঁচু নিচু করা যায়। ছাউনির মাঝামাঝি জায়গায় গোল করে গাব বা খিরন লাগানো হয়। খিরন তৈরি করা হয় ময়দার সাথে লোহার গুঁড়া, কয়লার গুঁড়া এবং আঠা মিশিয়ে। বাঁয়ার আকৃতি তবলার চেয়ে কিছুটা বড়। বাঁয়া মাটি বা ধাতু দু’ধরনের পদার্থ দিয়ে তৈরি হতে পারে।

ধাতুর মধ্যে তামা ও পিতল ব্যবহৃত হয়। তামার দাম বেশি, তাই পিতলের ব্যবহারটাই বেশি। গঠন কৌশল অনেকটা তবলার মতই। ফাঁপা কাঠামো তৈরি করে তার ওপর ছাউনি লাগানো হয়। ছাউনির ওপর খিরন লাগানো হয়। তবে ছাউনির টান ঠিক রাখার জন্য বায়াতে ধাতুর তৈরি রিঙ ব্যবহার করা হয়। তবলার মুখের ব্যাস পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি, উচ্চতা সাধারণত সাড়ে দশ ইঞ্চি। বাঁয়ার মুখের ব্যাস আট থেকে দশ ইঞ্চি, উচ্চতায় প্রায় তবলার সমান।

 

প্রচলিত আনদ্ধ যন্ত্র তবলা

ছবি – তবলা-বাঁয়া

 

আরও দেখুন :

Leave a Comment