প্রচলিত ছড় দিয়ে বাজানোর যন্ত্র

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় প্রচলিত ছড় দিয়ে বাজানোর যন্ত্র

প্রচলিত ছড় দিয়ে বাজানোর যন্ত্র

প্রচলিত ছড় দিয়ে বাজানোর যন্ত্র

উত্তরে হিমালয় থেকে শুরু করে পশ্চিমে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পাহাড়ী অঞ্চল এবং অপরদিকে পূর্বে বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত সমগ্র উপমহাদেশীয় অঞ্চলে সুপ্রাচীন কাল থেকে ছড় দিয়ে বাজানোর নানা ধরণের বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন চলে এসেছে। এ সমস্ত অঞ্চলের লোক সংগীতে, অথবা যে সব এলাকা পাহাড়ী, সেখানকার পাহাড়ী গোত্রে প্রচলিত বিভিন্ন ধরণের গানের সঙ্গে অনুষঙ্গ হিসেবে এ ধরণের ধনুযন্ত্রই সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন।

ধারণা করা হয় ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন যন্ত্রটি ছিলো ধনুযন্ত্র। রাবনাস্ত্র অথবা রাবণহস্ত বীণা অথবা রাবণহাতি বীণা নামে অত্যন্ত প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রের পরিচয় পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকেই। এটি ছিলো প্রথম যুগের বাদ্যযন্ত্র। কারো কারো মতে এটিই প্রথম বাদ্যযন্ত্র, ধনুকের উচ্চার শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে রাবন এই বাদ্যযন্ত্র আবিস্কার করেছিলেন। প্রাচীন রাবনহস্ত বীণার সাথে সারেঙ্গীর বিবর্তনমূলক সম্পর্ক কতখানি তা গবেষণা সাপেক্ষ বিষয়।

তবে ধনুষঙ্গ হিসেবে রাবনহস্ত বীণা, সারেঙ্গী, এস্রাজ সবই একটি বৃহত্তর দলের অন্তর্ভুক্ত। এদের মধ্যে সাধারণ বিষয় হচ্ছে এগুলো ছড় দিয়ে বাজানো হয়। ছড় দিয়ে বাজানোর কারণে এ যন্ত্রে টানা সুরের সৃষ্টি হয় যা অনেকটা মানুষের কন্ঠের অনুরূপ। মানুষের কন্ঠের অনুরূপ হওয়ার কারণেই সম্ভবত বিভিন্ন অঞ্চলে কন্ঠসংগীতের সহযোগী যন্ত্র হিসেবে এই জাতীয় যন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড় দিয়ে টানা বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন বেশি, তাই কখন থেকে উচ্চাঙ্গ সংগীতের জগতে ধনুর্যন্ত্রের প্রচলন হলো তার সুস্পষ্ট লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় না। বর্তমানে প্রচলিত ধনুযন্ত্রগুলোর মধ্যে সারেঙ্গী সবচেয়ে প্রাচীন। কিন্তু ঠিক করে এর উৎপত্তি সঠিকভাবে বলা যায় না ।

সারেঙ্গী যন্ত্রের নাম উল্লেখ না করে যদি সামগ্রিকভাবে আমরা ধনুর্যন্ত্রের ইতিহাস অনুসন্ধান করি, তাহলে প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রাপ্ত বিভিন্ন গুহাচিত্র, রিলিফচিত্র ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা যায়। খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীত প্রাপ্ত এইসব শিল্পকর্মে ধনুর্যন্ত্রের চিত্র পাওয়া গেছে। যেমন অন্ধ্রের বিজয়বাড়া ও মহীশূরের অর্কেশ্বর মন্দির। সারিন্দা জাতীয় বাদ্যযন্ত্র পশ্চিম বাংলার বিষ্ণুপুরে এবং সারেঙ্গী ধরনের যন্ত্র পশ্চিম ভারতের কয়েকটি মন্দিরের ভাস্কর্যে দেখা যায়।

এইসব প্রমাণ থেকে অনায়াসে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে এ অঞ্চলে প্রায় এগারশ বছর ধরে ছড়ে টানা বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন রয়েছে।
আধুনিক যুগে প্রচলিত পশ্চিমা যত্ন বেহালাও এ জাতীয় যন্ত্র। পশ্চিমা জগত থেকে বেহালার আগমন হলেও উপমহাদেশে প্রচলিত ধনুর্যন্ত্রের মধ্যেই বেহালার উৎপত্তির মূল নিহিত রয়েছে বলে অধিকাংশ মনিষীরা একমত। বি.সি. দেবের মতে সমগ্র উপমহাদেশে এমন কোন অঞ্চল নাই যেখানে বেহালা জাতীয় যন্ত্রের প্রচলন নাই।

গুজরাট, রাজস্থান এবং পশ্চিম ভারতের কোন কোন স্থানে রাবনহস্ত বীণা নামে যে সুপ্রাচীন বাদ্যযন্ত্রের কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে তার প্রচলন আজও কমবেশি রয়ে গেছে। নারকেলের মালা দিয়ে এর শব্দ প্রকোষ্ঠ তৈরি হয়। নারকেলের মালা কেটে মুখটা চামড়া দিয়ে ছাওয়া হয়। সঙ্গে একটি সরু বাঁশের দণ্ড লাগানো হয়। দু’টি তার থাকে যন্ত্রে, সেগুলো থেকে ছড়ের সাহায্যে স্বর উৎপন্ন করা হয়।

 

প্রচলিত ছড় দিয়ে বাজানোর যন্ত্র

চিত্র – রাবনহস্ত বীণা

ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত চিত্রে রাবনহস্ত বীণার খোলটি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তবে ছড়টি বেশ বড় বলে চোখে পড়ে। হুড়ে ঘুঙুর লাগানো থাকে, ছড় টানার সময় টুন টুন করে শব্দ সৃষ্টি করে। ছড়ের একটি স্কেচ নিচে দেওয়া হলো।

 

প্রচলিত ছড় দিয়ে বাজানোর যন্ত্র

চিত্র – রাবণহস্ত বীণার ছড়

অন্ধ্রে ও মহারাষ্ট্রে এর কাছাকাছি ধরণের যন্ত্র ‘কিংরি’ এবং মণিপুরে ‘পেনা” এবং উড়িষ্যায় ‘বনম’ প্রচলিত।

বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এ ধরণের যে লোক যন্ত্রটি প্রচলিত তার নাম হচ্ছে সারিন্দা। সারিন্দার আকার একটু বিশেষ ধরণের। বেশিরভাগ যন্ত্রের শব্দ প্রকোষ্ঠ গোল বা লম্বাটে গোল ধরণের হয়ে থাকলেও এর শব্দ প্রকোষ্ঠের দুই পাশ এত গভীর করে কাটা যে গোল অকারের কোন প্রভাব সহজে বোঝা যায় না। এই গভীর খাঁজ কাটার কারণে নিচের অংশ সরু দেখায়, তুলনামূলকভাবে উপরের অংশ প্রশস্ত।

দেখতে অনেকটা পাখির আকারের মত মনে হয়। নিচের অংশটিতে চামড়ার ছাউনি থাকে, উপরের অংশ অনাবৃত থাকে  জোয়েপ বোর আরো বলেছেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শার্জদেব তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করার দু’শ বছর আগেও সারেঙ্গী অত্যন্ত জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র ছিলো। প্রাকৃত ভাষায় রচিত জৈন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় কাহিনীতে এর যথেষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়।

১০৫২ খ্রিষ্টাব্দে জ্ঞানেশ্বরসুরী রচিত “কথাকোষপ্রকরণ” গ্রন্থে একে তত জাতীয় যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রাকৃত সাধারণ মানুষের ভাষা হিসেবে পরিগণিত। তাই ধারণা করে নেওয়া যায় সাধারণ মানুষের কাছে লোক এবং ধর্মীয় সংগীতের অনুষঙ্গ হিসেবে যন্ত্রটি প্রচলিত ছিলো। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামের আঞ্চলিক ধরণের সারেঙ্গীর কথা শোনা যায়। যেমন, যোগিয়া সারেঙ্গী, সিঙ্গী সারেঙ্গী, ধানী সারেঙ্গী, গুজরাতান সারেঙ্গী, পাইলেদার সারেঙ্গী ইত্যাদি ।

উচ্চাঙ্গ বাদ্যযন্ত্র হিসেবে সপ্তদশ অথবা অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে সারেঙ্গীর ব্যবহার শুরু হয়। ধ্রুপদী সংগীতের পরে খেয়ালের প্রচলন যখন থেকে শুরু হলো তখন সাথে সারেঙ্গীর প্রচলন হয়। পূর্ববর্তী যুগে ধ্রুপদী সংগীতের সাথে বীণার সাহায্যে সংগত করা হতো। কিন্তু খেয়াল প্রচলনের পর এর সাথে সংগত করার জন্য নতুন কোন বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।

কারণ খেয়ালের স্টাইলের সাথে বীণার স্টাইল মানানসই ছিলো না। এর আগে নর্তকীদের নৃত্য ও গীতের সাথে সারেঙ্গীর সাহায্যে সংগত করার প্রচলন ছিলো। তখনই সংগীতজ্ঞদের নজরে আসে যে, কন্ঠসংগীতের সহযোগিতা করার অসাধারণ এক গুণ রয়েছে এই যন্ত্রের। ক্রমে উচ্চাঙ্গ সংগীতের সহযোগী হিসেবে স্থান করে নেয় সারেঙ্গী। উচ্চাঙ্গ সংগীতের সহযোগী হিসেবে প্রবেশ করার পর প্রায় দুইশ বছর একচেটিয়া রাজত্ব করে সারেঙ্গী।

সারেঙ্গীর সাহায্যে কণ্ঠে পরিবেশনের উপযোগী সব ধরণের কাজই বাজানো যায়। খেয়াল, ঠুমরি, টপ্পা অথবা ভজন যাই হোক না কেন, সহযোগী হিসেবে সারেঙ্গী এক কথায় অনন্য। সেই কারণে সারেঙ্গীবাদকেরা উচ্চাঙ্গ সংগীতে পর্যাপ্ত তালিম গ্রহণ করে তবেই সারেঙ্গী বাদন শুরু করেন। প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পীদের মধ্যে ওস্তাদ আবদুল করিম খান, ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান এবং ওস্তাদ আমীর খান প্রথম জীবনে সারেঙ্গী বাদক ছিলেন।

জোয়েপ বোর সারেঙ্গী বাদনের জন্য দিল্লীর নিকটবর্তী প্রসিদ্ধ কয়েকটি শহরের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন, পানিপাত, সোনিপাত, কিরানা, শাহরানপুর, মুজাফফরনগর, মিরাট, মুরাদাবাদ, বুলান্দশহর ইত্যাদি প্রসিদ্ধ। মর্যাদাসম্পন্ন উচ্চাঙ্গ বাদ্যযন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ‘পানিপাত-সোনিপাত’ ঘরানার প্রখ্যাত সারেঙ্গী বাদক ওস্তাদ হায়দার বখস-এর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ওস্তাদ হায়দার বখস সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের সভা সংগীতজ্ঞ ছিলেন। তিনি সারেঙ্গীতে আধুনিক এবং পরিশীলিত বাদনরীতির প্রবর্তন করেন এবং একটি সমৃদ্ধ যন্ত্র হিসেবে একে প্রতিষ্ঠা করেন। সারেঙ্গীর আওয়াজ অত্যন্ত সুরেলা এবং সুমিষ্ট। তবে এর আকার একটু বিশেষ ধরণের। অন্যান্য যন্ত্রের মতই এর নিচের অংশটা ফাঁপা একটি প্রকোষ্ঠের মত যাকে শব্দ প্রকোষ্ঠ বলা হয়। অনেকটা চৌকোনা ধরণের ।

কিন্তু অসমান আকৃতির। মূল কাঠামো আয়াতাকার ধরে নিলে দুই পাশ গভীরভাবে ভেতরের দিকে কেটে নেওয়া হয়েছে। এই গভীরতা দুই পাশে সমান নয়। সারেঙ্গী সাধারণত দুই থেকে সোয়া দুই ফুট লম্বা হয়ে থাকে, চওড়ায় প্রায় ছয় ইঞ্চির মত এবং চার ইঞ্চির কিছু বেশি পুরু। ওজন প্রায় দুই কেজির মত। তবে কোন মাপই নির্দিষ্ট নয়। সম্ভবত সারেঙ্গীই একমাত্র বাদ্যযন্ত্র যার ক্ষেত্রে শুধু একথা বলা যায় যে, কোন একটি যন্ত্রের সাথে অপর একটি যন্ত্র হুবহু মিলে না।

মাপে কিছু না কিছু গরমিল থাকবেই। সারেঙ্গী তৈরি হয় নিরেট এক খণ্ড কাঠ থেকে। সাধারণত মেহগনি কাঠ এ কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে সেগুন কিংবা আম কাঠও ব্যবহৃত হয়। সারেঙ্গীর তিনটি অংশ- পেট, ছাতি এবং মগজ। পেটের অংশ সামনে থেকে খুদে ফাঁপা করা হয়, ছাতি এবং মগজ পেছন থেকে খুদে ফাঁপা করা হয়। পেট অংশটি হচ্ছে এর শব্দপ্রকোষ্ঠ।

সম্পূর্ণ সারেঙ্গীর আকার অনিয়মিত। এমনকি কোমরের অংশের গভীরতাও সমান নয়, ডান দিকের চেয়ে বাম দিক বেশি গভীর। পেট বা শব্দপ্রকোষ্ঠের উপরে ছাগলের চামড়ার ছাউনি দেওয়া থাকে। ছাতির ডান পাশে তিন সারিতে তরফের তারের জন্য ছোট ছোট খুঁটি লাগানো থাকে। তরফের তার পঁয়ত্রিশ থেকে ঊনচলিল্লশটা থাকে। সেই অনুযায়ী খুঁটির সংখ্যাও নির্ধারিত হয়।

সারেঙ্গী বাজানোর জন্য অস্ত্রী তার ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ছাগলের অস্ত্র বা নাড়ী থেকে এই তার তৈরি হয়। মগজ অংশে দুটি বিভাগ থাকে। উপরের অংশে তরফের তারের খুঁটি লাগানো হয়। নিচের অংশে চারটি বড় খুঁটি থাকে, তিনটি মূল তারের জন্য এবং অন্যটি একটি মোটা ধাতব তরফের তারের জন্য । সারেঙ্গীতে তিনটি ব্রিজ ব্যবহৃত হয়। মূল তারের জন্য একটি ব্রিজ পেট অংশের উপরে চামড়ার তৈরি একটি বেল্ট দিয়ে আটকানো থাকে।

অন্য দুটি তরফের তারের জন্য, এগুলো আকারে ছোট এবং চেষ্টা। সারেঙ্গী বাজানো হয় ছড় দিয়ে। এর ছড়কে গজ বলা হয়। প্রায় বাইশ ইঞ্চি লম্বা পাতলা কাঠের সাথে ঘোড়ার লেজের চুল টান টান করে আটকিয়ে গজ তৈরি করা হয়। সারেঙ্গীর মত ছড় দিয়ে বাজাতে হয় এমন আরো কয়েকটি যন্ত্রের নাম হলো তাউস, দিলরুবা, এস্রাজ। তবে সারেঙ্গীর সাথে এই তিনটি যন্ত্রের পার্থক্য আছে।

তাউস, দিলরুবা এবং এস্রাজের উপরের অংশ সেতারের মত। কিন্তু নিচের অংশ সেতারের মত নয়, সেতারের মত এগুলোর পাতলা কাঠের তবলী নাই। বরং সারেঙ্গীর মত চামড়ার আচ্ছাদন দেওয়া একটি খোল রয়েছে এবং সারেগীর মতই এই যন্ত্রগুলো ছড় দিয়ে বাজাতে হয়। এই যন্ত্রগুলোকে সেতার এবং সারেঙ্গীর সমন্বয় বলা যেতে পারে। তিনটি যন্ত্রের মধ্যে তাউস সবচেয়ে প্রাচীন। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তাউস যন্ত্রের আবির্ভাব।

১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে রচিত ‘মাদান-আল-মুসিকী’ গ্রন্থে, ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে সৌরিন্দ্র মোহন ঠাকুর রচিত “যন্ত্র কোষ” গ্রন্থে এবং ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে সাদিক আলী রচিত ‘সরমাইয়া-ই-ইসরাত গ্রন্থে তাউস যন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই যন্ত্রের উৎপত্তি পাঞ্জাবে। স্বামী প্রজ্ঞানানান্দের মতে এস্রাজ যন্ত্রের গঠনে বাঙালী সংগীতজ্ঞদের অবদান রয়েছে।

১৮৫৭ সালে নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ্ যখন লখনৌ থেকে নির্বাসিত হয়ে কোলকাতার মাটিয়াবুরুজে দরবার স্থাপন করেন তখন তাঁর দরবারের কোন সংগীতজ্ঞের হাতে এস্রাজ বর্তমান রূপ লাভ করে। এরপর সেনিয়া ঘরানার প্রখ্যাত রবাব বাদক বাসত খান সম্ভবত এই যন্ত্রটি সঙ্গে নিয়ে গয়াধামে চলে যান। সেখানে তিনি অনেক শিষ্যকে এস্রাজ যন্ত্রে তালিম দেন। এভাবে সমগ্র বিহারে যন্ত্রটি ছড়িয়ে পড়ে।

 

প্রচলিত ছড় দিয়ে বাজানোর যন্ত্র

 

এস্রাজ যন্ত্রটি ক্রমান্বয়ে বিষ্ণুপুর ঘরানায় প্রসার লাভ করে। গয়ার পরে পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, উড়িষ্যা এবং আসামে যন্ত্রটির ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখা যায়। এস্রাজ যন্ত্রের প্রতি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ দুর্বলতা বাঙালীদের মধ্যে এস্রাজ জনপ্রিয় হওয়ার একটি মূল করাণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই যন্ত্রটিকে খুবই গুরুত্ব দিতেন, যে কারণে রবীন্দ্র সংগীতের সাথে সঙ্গত করার জন্য এস্রাজ রীতিমত একক আধিপত্য নিয়ে বিরাজ করে দীর্ঘদিন।

ক্রমে হারমনিয়ামের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে রবীন্দ্র সংগীতের সঙ্গে এস্রাজের ব্যবহার কিছুটা কমে আসে, তবে এর জনপ্রিয়তা এখনো উল্লেখযোগ্য। শুধু সঙ্গত করার যন্ত্র হিসেবে নয়, একক যন্ত্র হিসেবেও এস্রাজের নিজস্ব একটি অবস্থান গড়ে উঠেছে। এস্রাজে মূল তারের সংখ্যা চারটি। এছাড়া তরফের তার রয়েছে তরফদার সেতারের মত। তারের সংখ্যা বারো থেকে পনের। ধাতুর তৈরি পর্দা রয়েছে কুড়িটি ।

আরও দেখুন :

Leave a Comment