প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য বন্দনা

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য বন্দনা

প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য বন্দনা

 

প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য বন্দনা

 

প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য বন্দনা

রবীন্দ্রনাথের রচিত প্রায় সকল গানেই কোনো না কোনোভাবে কবি প্রকৃতির দারস্থ হয়েছেন। কী পূজা কী প্রেম, তেমনি স্বদেশ বন্দনার প্রসঙ্গেও কবি স্বদেশের প্রকৃতির সৌন্দর্যের কথা ব্যক্ত করেছেন পরম আদরে। জীর্ণ শীর্ণ স্বদেশমাতা যে প্রকৃতিগতভাবে অপরূপ সৌন্দর্যের আধার এবং এই রূপকে অক্ষত রাখতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। এই প্রত্যাশাই করি বারংবার প্রকাশ করেছেন তাঁর গানে।

‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি / চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশী। এই গানটির মধ্যে কবি দেশমাতার যে রাগের বর্ণনা করেছেন তাতে প্রকৃত বাংলাদেশের চিরাচরিত স্বরূপটিই তুলে ধরেছেন। তাঁর এই গানের বাণী ও সুরের মূর্ছনায় দেশসন্তানের হৃদয়কে আকুল করেছেন। ফাল্গুনের আমের বোল আর অঘ্রাণের ভরা খেত যেকোনো বাঙালির হৃদয় হরণ করে।

এদেশের প্রকৃতির শোভা আমাদের প্রাণ জুড়ায়, গাছের ছায়া মনকে শান্ত করে। যত দরিদ্রই হোক না কেন এই মা তার রূপের সম্ভারে ঐশ্বর্যমণ্ডিত। বঞ্চিত করেন না তাঁর সন্তানকে । প্রকৃতির শ্যামলিমায় মাখা এ মায়ের কোমল মূর্তি প্রতিটি বাঙালির মর্মে গ্রন্থিত। সবুজে ঘেরা এর প্রকৃতি বলয়ের কারণেই এই বাঙালির মন সবুজের মতো সুন্দর। বাঙালি অতিথি পরায়ণ । পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ / বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছল জলধিতরঙ্গ।

বহু বিচিত্র প্রকৃতির সমন্বয়ে সৃষ্ট ভারতবর্ষের ভূমি। পাহাড়, নদী, মরুভূমি সকলের যেন একটি হৃদয় ভাগাভাগি করে প্রস্ফুটিত একটি নীলপদ্ম। কবি এই ভারতমাতার প্রকৃতির বন্দনা করেছেন তাঁর স্বদেশপর্বের গানে।

‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ গানটির মধ্যেও কবি স্বদেশের প্রকৃতির ঐশ্বর্য বন্দনা করেছেন। বাংলা মায়ের অপরূপ রূপ দেখে তার সন্তানের আঁখি ফেরে না। দুঃখিনী মায়ের দুঃখ, দারিদ্র্য ও মলিন হাসি দীপ্তি ছড়ায় দুয়ার খোলা সোনার মন্দিরের আভায়।

‘অয়ি ভুবন মনমোহিনী, মা’ গানটিতে স্বদেশমাতার অবিস্মরণীয় রূপের বর্ণনা করেছেন কবি। তিনি নীলসিন্দুজল থেকে হিমাচল পর্যন্ত বিচিত্র রূপের শ্যামলিমায় তুষার আচ্ছাদিত শুভ্র আবরণের বর্ণনা করেছেন। বাহ্যিক রূপের সাথে আত্মিক রূপের ভাণ্ডারেও যে পুণ্যভূমি পরিপূর্ণ সে কথাও কবি ব্যক্ত। করেছেন এই গানটিতে। জ্ঞানধর্মের নির্দেশক কত কাব্য-কাহিনি রচয়িতার জন্ম এ ভূমিতে।

 

Google news
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

 

চিরকল্যাণময়ী এ ভূমি শুধু দেশই নয়, যেকোনো বিপদে বহির্বিশ্বকেও অন্ন বিতরণে সহায়ক হয়। এর জাহ্নবী যমুনার জলে তৃষিত পায় প্রাণ। স্বদেশপর্বের আরেকটি বিখ্যাত গান ‘আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে। এতেও কৰি অপরূপ ভাবনায় স্বদেশমাতৃকার রূপের বর্ণনা করেছেন। রূপকতায় প্রকৃতির আশ্রয়ে কবি সকলকে জেগে উঠতে বলেছেন। প্রভাতে শুকতারা নির্দেশিত পথে এগিয়ে যেতে বলেছেন কবি। স্বার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে/স্বার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনপর্বে রচিত এই গানটি স্বদেশমাতার প্রকৃতির ছায়ার পরশে অঙ্গ জুড়াবার মতো আত্মনিবেদনের সুর নিঃসৃত। স্বদেশে বনে যে ফুল ফুটে তার গন্ধে আকুলতা রয়েছে। স্বদেশের আকাশে যে চাঁদ ওঠে সেই চাঁদের হাসির মতো মধুরতা কবি কোথাও খুঁজে পাননি। তাই কবি মাতৃভূমিতেই নিজের দেহ ত্যাগ করবার বাসনা ব্যক্ত করেছেন।

যে আলোতে তিনি স্বদেশের ভেতর দিয়ে বিশ্বকে ছুঁয়েছিলেন সেই আলোতেই তিনি তাঁর নয়ন মুদবার বাসনা রেখেছেন। এমন করে স্বদেশের রূপের বর্ণনা খুব বেশি চোখে পড়ে না। এই গানটির মধ্যদিয়ে স্বদেশের বহুবিধ রূপ অবগাহন করতে করতে শেষ পঙতিতে এসে অশ্রুশাত হয়ে যায়। প্রতিটি শ্রোতা ও শিল্পীর মন একটি বিন্দুতে। এসে দাঁড়ায়, তা হলো কবির মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অপরূপ জন্মভূতিতে নিজের জীবনের শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের বাসনা।

‘জাতীয় সংগীত’ পর্বের গান ‘ভারত রে, তোর কলঙ্কিত পরমাণুরাশি গানটিতে কবির আফসোসের গ্লানি ধ্বনিত হয়েছে। এরমধ্যেও কবি ভারতমাতার বিকশিত ফুল, পাখির গান, স্বর্ণশস্যময়ী ভূমি এবং এর উচ্ছ্বসিত নদীর রূপের বর্ণনা করেছেন। ভারতমাতার এ হেন গর্বের কথা স্মরণ করতে বলেছেন তার সন্তানকে। কলঙ্কমুক্ত না হলে এর সকল ঐশ্বর্য ম্লান হবে।

এর সিন্ধু, হিমগিরিসহ সকল কীর্তি ইতিহাস শত্রুকুল গ্রাস করবে। তাই কবি সন্তানদের জেগে উঠতে বলেছেন। স্বদেশপর্যায়ের গানে রবীন্দ্রনাথ যে স্বদেশমাতার রূপের অবগাহন করে তাতে স্বদেশচেতনার বিকিরণ ঘটাতে চেয়েছেন। তেমনি পূজাপর্বসহ অন্যান্য সকল পর্বেই তিনি প্রকৃতির আশ্রয় করেছেন বহুবিধ বিচিত্র ভাব প্রকাশে।

 

প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য বন্দনা

 

যেমন ‘ভুবনজোড়া আসনখানি’ পূজাপর্যায়ের গানটিতে রাতের তারা দিনের রবি থেকে শুরু করে ফুল ও ঝড়ের পরশকেও তিনি স্পর্শ করতে চেয়েছেন। তেমনি ঝড়ের মেঘের মতো আমি ধাই’ পূজাপর্বের গানের মতো অনেক গানেই প্রকৃতির আশ্রয়ে তিনি স্বদেশের রূপের বর্ণনা করেছেন।

আরও দেখুন :

Leave a Comment