বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগ

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগ

বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগ

 

বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগ

 

বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগ

বাংলাভাষা তথা বাংলা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ অতুলপ্রসাদের স্বদেশভাবনার এক অনন্য দিক। সাহিত্য বিষয়ে আড্ডাও তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিলো। শত কাজের ব্যস্ততাতেও ছুটির দিনে বাড়িতে বসতো গল্প-কবিতা-গান আর চা-পানের আসর। সাহিত্য অনুরাগী কতিপয় ব্যক্তিত্ব সেই আসরের নিয়মিত অতিথি ছিলেন।

ধূজটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রাধাকমল মুখোপাধ্যায়, নির্মল সিদ্ধার্ত, বিনয়েন্দ্র দাসগুপ্ত, হেমেন্দ্রলাল রায়, রবীন্দ্রলাল রায়, ভীমসেন, অসিত হালদার, অম্বিকাচরণ মজুমদার, প্রশান্ত দাসগুপ্ত, শরীন দত্ত, অশোখপ্রসাদ বন্ধ্যোপাধ্যায়, হামিদ আলী খাঁ-এর মতো সাহিত্যিকদের সমাগম হতো তাঁর বাড়ির সাহিত্য আড্ডায়। আসরের একটি অন্যতম উদ্দেশ্যছিলো বাংলার প্রতি অতুলপ্রসাদের আত্মিক অনুরাগ। এই সাহিত্য আড্ডা প্রসঙ্গে অরুণপ্রকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য তুলে ধরা হলো-

“তাঁর (অতুলপ্রসাদ) কাছে বঙ্কিম, দ্বিজেন্দ্র, রবীন্দ্র প্রভৃতির রচনা বা তাঁদের জীবনের ঘটনাগুলি শুনিতে, পড়িতে, আলোচনা করিতে ভালবাসিতাম। তাঁর নিজের রচিত দেশ- সংগীত বা প্রেম-সংগীত আমাদের শুনিবার বা যাহার ইচ্ছা লিখিবার সুযোগ হইত। হোলীর দিনে হোলীর গান, শ্রাবণের বরিষায় বর্ষাসংগীত, শারদীয়া বৈকালে পূরবীর তানে বারে বারে শুনিতাম, কখনও পুরাতন হইত না।

এই সাহিত্যের আখড়ায় অতুল যেমন প্রাণ খুলিয়া হাসিতেন, গল্প করিতেন এমন কোথাও নয়।… বাঙলা রচনায় তিনি আমাদের উৎসাহ দিতেন। …. বর্ষা সুন্দরীকে বিদায় নিবেদন উপলক্ষে অতুল আমাদের কবিতা রচনা করিতে আদেশ করেন। ….এসব রচনার মূলে অতুলের প্রেরণা। তিনি সব সময় চাহিতেন যেন আমরা বাংলার তুলি দিয়া বাঙালির মর্মকথা গদ্যে ও পদ্যে চিত্রপটে অঙ্কিত করিয়া বঙ্গভারতীর পূজার উপঢৌকন দিই।

প্রবাসী বাঙালির কাছে তাঁর এই নিবেদন পরে প্রবাসী সাহিত্য সম্মেলনে পর্যবসিত হইয়াছিল। লক্ষ্মৌতে রবীন্দ্র-সংবর্ধনার আয়োজন করলেন অতুলপ্রসাদ সেন। লক্ষ্ণৌর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এ এক অনবদ্য ঘটনা। লক্ষ্মৌ শহরের রূপ বদলে গেল। সারা শহরের রাস্তা-ঘাট ফুল পাতায় সেজে উঠল।

সেইবার বাংলা ভাষার প্রতি অদম্য প্রেমী অতুলপ্রসাদ রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির আনন্দে রচিত বিখ্যাত ‘মোদের গরব, মোদের আশা’ গানটি রবীন্দ্রনাথের সামনে প্রথম গেয়ে শোনালেন। সকলে মুগ্ধ চিত্তে তা শ্রবণ করলেন। শুধু তাই নয় শুদ্ধ বাংলার ব্যবহারেও সচেষ্ট ছিলেন তিনি। বাংলা ভাষার সাথে গ্রিক শব্দের প্রচলনেও তাঁর আপত্তি ছিলো।

তাই তিনি সেইবার লক্ষ্মৌতে রাধাকল মুখোপাধ্যায় ও রাধাকুসুম মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজনকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার বহুল ব্যবহৃত ও প্রচলিত গ্রীক শব্দ ‘সুরঙ্গ’ শব্দের যথার্থ বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে বের করতে অনুরোধ করেন।
অতুলপ্রসাদ সেন ১৯২২ সালে ‘বঙ্গসাহিত্য সমাজ-এর বার্ষিক উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে যান। এই উৎসবের কর্ণধার ছিলেন কানপুরের সমাজসেবী ডাক্তার সুরেন্দ্রনাথ সেন এবং সভাপতির দায়িত্ব পড়ে অতুলপ্রসাদ সেনের উপর। ‘বঙ্গসাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক উৎসবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা যায়-

“নানা কারণে বহির্বঙ্গের বাঙ্গালির চিন্তাধারায় বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা ও অনুশীলনের ধারাবাহিকতায় ঘাটতি গভীরভাবে কিছু বাঙালি মনীষার হৃদয়কে বিব্রত করেছিল। সেই সূত্রেই মাতৃভাষা ও মাতৃ সংস্কৃতির প্রতি ঔদাসীন্য দূর করা তথা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্মতা স্থাপনের একটা ভাবনা কিছু চিন্তাশীল মানুষের মনে দোল খাচ্ছিল।

তারই একটা সংহত রূপের প্রয়াস আকাঙ্ক্ষায় উত্তরপ্রদেশের কানপুরের ‘বঙ্গসাহিত্য সমাজ গৃহে এর বার্ষিক উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে এলেন লক্ষ্মৌ থেকে অতুলপ্রসাদসহ আরো অনেক। সেই বার্ষিক সভায় অতুলপ্রসাদ বহির্বঙ্গে বসবাসকারী বাঙালিদের একটি ‘সম্মিলনী’র গুরুত্ব প্রকাশ করেন। বাঙালিরা ইংরেজ শোষক দ্বারা চরমভাবে অত্যাচারিত ও নিগৃহীত হয়ে চলেছে।

 

বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগ

 

তাই বাঙালিদের সম্মিলনের কথা শুনলেই শুরুতেই শোষকশ্রেণি বাঁধা দিবে যুক্তিতে অতুলপ্রসাদ সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ভাষা ও সাহিত্য সম্মিলনী প্রস্তাব দেন। ডা. সুরেন্দ্রনাথ সেনও বহির্বঙ্গে বাঙালিদের একাত্মতা, আত্মরক্ষা এবং আত্মসমর্থনের লক্ষ্যে এমন একটি সম্মিলনীর গুরুত্ব রয়েছে বলে অতুলপ্রসাদ সেনকে সমর্থন করলেন।

সেই মতেই ১৯২৩ সালে কাশীতে রবীন্দ্রনাথের পৌরোহিত্যে অনুষ্ঠিত হয় ‘উত্তরভারতীয় বঙ্গসাহিত্য সম্মিলন। নেতৃত্বে এমনিভাবে সকল বাঙালি ভাষা ও সাহিত্য রক্ষার জন্য নিরলস সংগ্রাম করে গেছেন। অতুলপ্রসাদের স্বদেশ ভাবনার প্রতিফলন দেখতে পাই তাঁর বাংলা সাহিত্যের প্রতি নিবিড় অনুরাগেও। এখানে ১৯২৫ সালে লক্ষ্মৌ শহরে ‘প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলন’-এর দ্বিতীয় অধিবেশনে অতুলপ্রসাদের সুচিন্তিত ভাষণের অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো,

“মনে রাখিবেন আমাদিগকে বঙ্গবাণীর পূজার জন্য নূতন উপাচার সংগ্রহ করিতে হইবে; নূতন ভাষায় তাহাকে ভূষিত করিতে হইবে; বিবিধ সাহিত্য-কুসুম হইতে পরিমল সংগ্রহ করিয়া আমাদের মধুভাণ্ডারকে আরো মধুর করিতে হইবে। সাহিত্য সম্রাট রবীন্দ্রনাথ আজ বিশ্বজগতে আমাদের সাহিত্যকে যশস্বী করিয়াছেন; ভারতের দেশ-বিদেশে প্রবাসী বাঙ্গালীগণ বাংলা সাহিত্যের মহৎ বার্তা বহন করিবেন এবং প্রচার করিবেন।

আমাদের সাহিত্য সত্য, শিব ও সুন্দর। এই সত্য-শিব-সুন্দরের মন্দির ভারতের সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। বাঙ্গালীর সর্বোচ্চ সম্পদ তাহার সাহিত্য; ইহাকে সযত্নে রক্ষিত ও বর্ধিত করিতে হইবে। সাহিত্যপ্রেমী বন্ধুগণ, আমরা বহুদিন পরে প্রবাসে বঙ্গবাণীর উৎসব-মন্দির স্থাপন করিলাম।

পুরোহিত কিংবা উপাসকের অভাব হইবে না; কিন্তু ইহাকে চিরস্থায়ী করিতে হইলে হৃদয়ে ভক্তি চাই; গভীর নিষ্ঠা চাই: প্রচুর ধৈর্য চাই নতুবা আমাদের সাহিত্য-সাধনা নিষ্ফল হইবে। ক্ষণিক উৎসাহ কিংবা ভাবুকতায় আমাদের অভিষ্ট সিদ্ধ হইবে না; কার্যতৎপরতা, অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা, স্বার্থত্যাগ, পরার্থপরতা এ সদগুণসমূহের সমাবেশ হইলে তবে আমরা সফল হইব।”

এই বক্তব্যের মধ্যদিয়ে একজন দেশপ্রেমী সুচিন্তক নাগরিকের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও পরিকল্পনাগুলো ফুটে উঠেছে। তিনি ছিলেন সাহিত্য ও শিল্পকলার অত্যন্ত প্রগতিশীল এক পরিচালক। বিভিন্ন সভাসমিতি ভাষণের মধ্যদিয়ে তাঁর স্বদেশ ভাবনার এই সুচিন্তিত দিকটিই ফুটে ওঠে। এর মধ্যদিয়ে তিনি জনমনে সাহিত্য-শিল্প তথা স্বদেশের ভাষা ও স্বদেশমাতৃকার গুরুত্বের দিকটিকেই জোরালোভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতেন।

জনচিত্তের স্বাধীনতা আর মুক্তির বীজ বপনের মানসিকতা তৈরির জন্য তিনি শিক্ষার গুরুত্ব অনুভব করেন। এরসাথে গুরুত্বারোপ করেন পাঠাগার স্থাপনের। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,

“বাঙ্গালী জনসাধারণের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের প্রচার করিতে হইলে, যেখানে যেখানে সম্ভ বাংলা পুস্তকাগার সংস্থাপন করা একান্ত প্রয়োজনীয়। লাইব্রেরী সংক্রান্ত একটি কথা নিবেদন করা যুক্তিসঙ্গত মনে করি। পুস্তাকালয়ের উদ্দেশ্য পাঠক সাধারণের মধ্যে সুশিক্ষা বিস্তার করা। যে সাহিত্য পাঠে মনের উচ্চবৃত্তিগুলি পরিস্ফুট হয় সেই সাহিত্য পাঠে জনসাধারণকে প্রলুব্ধ করাই পুস্তকালয়ের মুখ্য উদ্দেশ্য।

 

বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগ

 

জনসাধারণ যাহা পাঠ করিতে চায় শুধু তাহা সংগ্রহ করাই পুস্তকাগারের কর্তব্য নহে, পুস্তক বিক্রেতার লক্ষ্য হইতে পারে। লঘু সাহিত্যের প্রতি স্বতঃই লোকের আকর্ষণ অধিক; যে সাহিত্য চিন্তাশক্তিকে সক্রিয় করে তৎপ্রতি সাধারণের দৃষ্টি অল্প। তাই সচরাচর পুস্তকাগারে গল্প ও উপন্যাসের বাহুল্য দেখিতে পাই। সে বিষয়ে আমাদের একটু সতর্ক হওয়া আবশ্যক। ”

বাঙালি জাতির প্রতি তাঁর গভীর প্রেম চিরকালের। এ সকল বক্তব্য ও চেষ্টায় একটি বিষয় স্পষ্ট, তিনি বাঙালির চিত্তকে জাগাতে চেয়েছিলেন। যথার্থ শিক্ষা, সাহিত্য ও শিল্পচর্চায় তিনি বাঙালির অন্তরাত্মাকে জাগাতে চেয়েছেন, তৃষিত করতে চেয়েছেন স্বাধীনতার প্রত্যাশায়।

আরও দেখুন :

Leave a Comment