বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

ধনুকাকৃতির পলিকর্ড, যার ইংরেজি নাম হার্প, বাংলায় বীণাও বলা হয়, এটি হচ্ছে পরিচিত সব থেকে প্রাচীন তত-যন্ত্র। একটি ধনুকে একটি তার যোজনা করেলে তাতে টোকা দেয়ে একটি স্বর উৎপন্ন করা যায়। একই ধনুকে অনেকগুলো তার যোজনা করলে বিভিন্ন স্বর উৎপন্ন হয়। এভাবে সৃষ্টি হয় হাপ। কাজেই একটি ধনুকের গুণের সঙ্গে অনেকগুলো সমান্তরাল তার যোজনা করলে প্রাথমিক ধরণের একটি হার্পের কাঠামো পাওয়া যায়।

ইতিহাসের প্রথম যুগে হার্প জাতীয় যন্ত্রের গঠন অনুন্নত ধরণের ছিলো, শব্দ। প্রকোষ্ঠ বলে তেমন কিছু ছিলো না। পরবর্তী সময়ে একেবারে শিকারীর ধনুকের মত তৈরি না করে ফাঁপা দন্ড দিয়ে এটি তৈরি হতে লাগলো। ফাঁপা অংশটি হলো শব্দ প্রকোষ্ঠ বা অনুনাদক এবং এর সাথে একটি ডান্ডা জুড়ে দিয়ে ধনুকাকৃতি করা হলো। এরপর এই ধনুকাকৃতির যন্ত্রে আড়াআড়িভাবে তার যোজনা করে পাওয়া গেল হার্প জাতীয় বীণা। এটি হলো প্রাচীন আমলের হার্প সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা।

এখন আমরা আলোচনা করব আধুনিক যুগের সংগীত শাস্ত্রে হার্প বলতে প্রকৃতপক্ষে কি বোঝায়। হার্প হচ্ছে এক প্রকার তারের যন্ত্র যেখানে তারগুলো শব্দ প্রকোষ্ঠের সাথে প্রায় খাড়াভাবে (লম্ব) অবস্থান করে।

 

বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

চিত্র – ছোট আকারের হাপ

হার্পকে একটি বাদ্যযন্ত্র না বলে একে বাদ্যযন্ত্রের একটি গোত্র বলা যেতে পারে। এটি একটি পলিকর্ড জাতীয় যন্ত্র, অর্থাৎ একটি তারে একটি স্বর বাজে। এভাবে যতগুলো স্বর বাজবে ততগুলো তার থাকবে। উপমহাদেশীয় ইতিহাসের গোড়ার দিকে বীণা হিসেবে যতগুলো যন্ত্র প্রচলিত ছিলো সবই ছিলো হাপ শ্রেণীর। প্রাচীন ইতিহাস ও সংগীত শাস্ত্রে দু’রকম হার্পের কথা গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করা হয়েছে।

একটি সাত তারযুক্ত, অপরটি নয় তারযুক্ত। সাত তারযুক্ত বীণা সপ্ততন্ত্রী বীণা নামে পরিচিত। এতে সাতটি তার থাকতো, অন্যটি বিপঞ্চাবীণা, এতে নয়টি তার থাকতো। প্রথমটি আঙুল দিয়ে বাজানো হতো। পরেরটি বাজানো হতো Plectrum বা ত্রিভুজাকৃতির কাঠের টুকরা দিয়ে। ভারত ও বুদ্ধগয়ার প্রাচীন স্তম্ভে পাঁচ তারযুক্ত হার্প দেখা যায়। অবশ্য বেশি দেখা যায় সাত তারযুক্ত হার্প।

যেমন, অজন্তার (তৃতীয় খ্রিঃ পূঃ) সন্নিকটে পিতলখোরা, মধ্যপ্রদেশের সাঁচী (দ্বিতীয় খ্রিঃ পূঃ), অন্ধ্রপ্রদেশের অমরাবতী ও নাগাৰ্জ্জুনকোন্ডার (তৃতীয় খ্রিস্টাব্দ) ভাস্কর্য ও উৎকীর্ণ শিল্পে। উপমহাদেশে প্রাপ্ত বেশিরভাগ হার্প ধনুকাকৃতি বা বাঁকানো (Arched Harp)। তবে অন্য ধরণের হার্প ও ছিলো বা রয়েছে। যেমন প্রাচীনকালে একটি যন্ত্র ছিলো মত্তকোকিলা, যা বর্তমানের সুরমন্ডলের অনুরূপ।

লাইয়ার

হাপ গোত্রের খুব কাছাকাছি ধরণের আরেকটি গোত্র হচ্ছে লাইয়ার (Lyre) বা লাইয়ার জাতীয় যন্ত্র। হার্পের সাথে চেহারায় অনেক মিল থাকলেও লাইয়ার আলাদা এ কারণে যে, হার্পের তারগুলো শব্দ প্রকোষ্ঠ থেকে খাড়াখাড়িভাবে উঠে আসে, লাইয়ার-এর ক্ষেত্রে তা হয় না। এখানে একটা শব্দ প্রকোষ্ঠ তৈরি করার পর সেটির দুই প্রান্ত থেকে দু’টো বাহু বের হয়ে উপরের দিকে উঠে যায়।

দু’টো বাহুকে প্রায় শেষ প্রান্তের কাছাকাছি জায়গায় একটা ক্রসবার সংযুক্ত করে রেখেছে। এই ক্রসবারটিকে বলে Yoke (ইয়ক)। অপরদিকে নিচে যেখানে শব্দ প্রকোষ্ঠ আছে সেখানে ছোটখাটো আরেকটা ক্রসবার লাগানো হয় যেটা আসলে তারের ব্রিজ বা সওয়ারি হিসেবে কাজ করে। এই ব্রিজের নিচে বা পেছনের অংশে সংযুক্ত একটা টেলপিস বা লেঙুটে তারগুলো লাগানো হয়।

এখান থেকে ব্রিজের উপর দিয়ে তারগুলো উপরে উঠে একেবারে ইয়ক পর্যন্ত চলে যায়। ইয়কের সাথে খুঁটির সাহায্যে অথবা অন্য কোন উপায়ে তার লাগানো থাকে। আরেকটি বিষয়ের বিবেচনায় লাইয়ার হার্পের চেয়ে আলাদা, তা হলো, হার্প বাজাতে হয় আঙুলের সাহায্যে তারে টোকা দিয়ে। কিন্তু লাইয়ার বাজাতে হয় প্লেকট্রাম দিয়ে আঘাত করে (যেমন করে গিটার বাজাতে হয়)। তাছাড়া সাধারণভাবে লাইয়ার হার্পের চেয়ে আকারে অনেক ছোট হয়ে থাকে।

 

বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

চিত্র –  ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত পাত্রের গায়ে আঁকা লাইয়ারের ছবি

এই উপমহাদেশে সম্ভবত লাইয়ার বাদ্যযন্ত্রটি ছিলো না। অথবা খুব কম প্রচলিত ছিলো। ড. বি. চৈতন্য দেব তাঁর সুদীর্ঘ গবেষণায় কেবল সিন্ধুসভ্যতার হায়ারোগ্লিফস্-এ লাইয়ার জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের অস্তিত্ত্ব অনুমান করতে পেরেছেন।

লিউট

লিউট বলতে সাধারণভাবে বোঝায় তারের যন্ত্র, যে যন্ত্রে তারে টোকা দিয়ে বা আঘাত করে বাজাতে হয় এবং যার নিচের অংশটা গোল, এই গোল অংশের সাথে লম্বা অংশ লাগানো থাকে যাতে পর্দা বা সারিকা লাগানো থাকে। তবে সব যন্ত্রে পর্দা নাও থাকতে পারে। তারগুলো তবলীর উপর দিয়ে গিয়ে লাউ বা কাঠের তৈরি শব্দ প্রকোষ্ঠ অতিক্রম করে এর নিচের দিকে লাগানো একটি টেলপিস বা লেঙুটে সংযুক্ত থাকে।

লিউট সম্পর্কে ড.বি. চৈতন্যদের বলেছেন, এটি সে ধরণের বাদ্যযন্ত্র যেখানে ফিংগারবোর্ডটি সাউন্ড বক্সের বর্ধিত অংশ মাত্র।
বর্তমানকালে বহুল ব্যবহৃত তানপুরা থেকে শুরু করে সেতার, সরোদ এবং এস্রাজ সবই লিউট গোত্রের যন্ত্র । লিউট জাতীয় যন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হলো এতে ছোট বা বড় গলা থাকবে। এই অংশটি সরাসরি শব্দ প্রকোষ্ঠের সাথে সংযুক্ত করা হয়। এই নির্মাণ কৌশলটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য এই কারণে যে, এ থেকেই সেতার, সরোদ তথা বীণা জাতীয় যাবতীয় ‘লিউট’ যন্ত্রের সূচনা।

 

বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

চিত্র – লিউট জাতীয় কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র

প্রাচীনত্বের দিক থেকে হার্প নিঃসন্দেহে প্রাচীনতর লিউট-এর চেয়ে। তবে ঠিক কখন করে লিউট আবিস্কার হলো তা সঠিকভাবে বলা যায় না। এটুকু বলা যায়, যে খ্রিষ্টীয় দশম শতকের পর লিউট জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের বহুল ব্যবহার চোখে পড়ে।

বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত ধারণা

ধনুকাকৃতির হার্প হচ্ছে উপমহাদেশের প্রাচীনতম হার্প। এই হার্পের কিছুটা উন্নততর সংস্করণ পরবর্তীকালে আবির্ভূত হয় যা আমাদের দেশের কাছাকাছি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বর্তমানকালেও প্রচলিত রয়েছে। আমাদের দেশে এ ধরণের হার্পের ক্রমবিবর্তন হয় নি। হার্পের পরবর্তী সময়ে জিহ্বার জাতীয় বাদ্যযন্ত্র এবং তারপর লিউট জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের প্রবল জনপ্রিয়তা এবং বাদনরীতির উৎকর্ষ সাধন হচ্ছে এর মূল কারণ।

আমাদের দেশে প্রাচীন আমলে ধনুকাকৃতির হার্প সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিলো। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে সপ্ততন্ত্রী বীণা। এই যন্ত্রে সাতটি তার থাকতো। প্রাচীন ভাস্কর্যে এই যন্ত্রের যে চিত্র পাওয়া যায় তা নিম্নরূপ।

 

বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

চিত্র – ভাস্কর্যে প্রাপ্ত সপ্ততন্ত্রী বীণার নমুনা)

প্রাচীন ভাস্কর্যে প্রাপ্ত সপ্ততন্ত্রী বীণার চিত্র লক্ষ্য করলে বোঝা যায় খুব সাধারণ কৌশলে এটি নির্মিত হয়েছে। এর নিচের দিকের মোটা অংশটি হচ্ছে শব্দ প্রকোষ্ঠ, সাধারণত ফাঁপা গাছের ডাল থেকে তৈরি। এরই এক প্রান্ত থেকে বাঁকানো একটি দণ্ড যুক্ত হয়ে ধনুকের আকৃতি সৃষ্টি করেছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী ভারগুলো শব্দ প্রকোষ্ঠের সাথে লম্বভাবে যুক্ত। প্রাচীন আমলের এই তারগুলো তৈরি হতো পশুর নাড়ী বা অস্ত্র থেকে।

এগুলোর একটি প্রান্ত শব্দ প্রকোষ্ঠ বা অনুনাদকের সাথে যুক্ত, অপর প্রান্ত বাঁধা হতো একটি চামড়ার পটির সাথে। সেই পটিটা আবার ঘুরিয়ে নিয়ে এসে দন্ডটির সঙ্গে বাঁধা হতো। লক্ষণীয় যে, যন্ত্রটিতে কোন খুঁটি বা বয়লা নাই। দন্ড বরাবর এই চামড়ার বন্ধন একটু উপরে বা নিচে করে তারের স্বরমাত্রার ওঠানামা পরিবর্তন করা হতো। অবশ্যই এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করা হতো।

প্রাচীন সপ্ততন্ত্রী বীণা থেকে তুলনামূলকভাবে আধুনিক যুগের বাদ্যযন্ত্র যেমন সেতার ও সুরবাহারের উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করে থাকেন। কিন্তু বাদ্যযন্ত্রের বিবর্তনের ধারায় বিকশিত বিভিন্ন গোত্রের (হার্প, লিউট, জিথার, লিউট) বাদ্যযন্ত্রের আবির্ভাব এবং প্রাচীন নিদর্শন থেকে এসব বাদ্যযন্ত্রের চিত্র বিশ্লেষণ করলে এ ধরণের ধারণা পোষন করার কোন অবকাশ নাই। সপ্ততন্ত্রী বীণা ছিলো ধনুকাকৃতির হার্প।

সেতার হচ্ছে লম্বা গলার লিউট। আধুনিক যুগে সেতারে মূল তারের সংখ্যা হচ্ছে সাতটি। এই সংখ্যাভিত্তিক মিল ছাড়া আর কোন মিল নাই সপ্ততন্ত্রীর সাথে। দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের যন্ত্র। বরং সপ্ততন্ত্রীর উন্নত সংস্করণ ‘সাউং গাউক’ নামক এক ধরণের ধনুকাকৃতির হার্প বর্তমান যুগে মিয়ানমারে প্রচলিত রয়েছে।

আকার ও আকৃতিতে এর বিশেষ সাদৃশ্য রয়েছে সপ্ততন্ত্রীর সাথে। মিয়ানমারের অধিবাসীরা তাদের এই ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র নিয়ে খুব গর্বিত, কারণ তারা মনে করে এই বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে তারা প্রাচীন ইতিহাসের সাথে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছে। সেতার ও সুরবাহারের মত লিউট যন্ত্রের উৎস বাস্তবসম্মত কারণেই হার্প হতে পারে না। বরং লিউট জাতীয় অন্য কোন প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রে এদের উৎস অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

উপমহাদেশের বাদ্যযন্ত্রের ইতিহাসে প্রথম যুগ ছিলো হার্প জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের। পরবর্তী যুগ হচ্ছে জিখার জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের এবং সবশেষ অর্থাৎ আধুনিক যুগ হচ্ছে লিউট জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের। প্রাচীন আমলে হার্প জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের বহুল ব্যবহারের প্রমাণ বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে আনন্দ কুমারস্বামী লিখেছেন “ভরত বর্ণিত বীণা বাদন কৌশল এবং সমসাময়িক মন্দির চিত্র থেকে এটুকু ধারণা করা যায় যে, সে আমলে প্রচলিত প্রায় সব বীণাই ছিলো হাপ গোত্রের। ”

সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংশাবশেষে যে সকল সিল মোহর পাওয়া গেছে তার মধ্যে কোন কোনটায় প্রাচীন হার্প জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের ছবি উদ্ধার করা গেছে। এগুলো ধনুকাকৃতির হার্প। এ ধরণের একটি শিলালিপির চিত্র নিচে দেওয়া হলো । প্রাচীন হার্প জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে সপ্ততন্ত্রী বীণার জনপ্রিয়তা ছিলো সবচেয়ে বেশি। এ প্রসঙ্গে স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ রচিত ‘ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হলো।

– “খ্রীষ্টপূর্ব ১ম থেকে ৭ম শতকে ভারতবর্ষীয় সামজে সপ্ততন্ত্রী বীণার যে যথেষ্ট প্রচলন ছিলো তা নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয়। পিতলখোরার গুহায় (অজন্তার পঞ্চাশ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং ইলোরার তেইশ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বৌদ্ধস্তূপের ধ্বংশাবশেষ) যে তিনটি সাত তার যুক্ত সন্ততন্ত্রী বীণা পাওয়া গেছে এম.এন.দেশপাণ্ডে

Ancient India ( Bulletin of the Archeological Suevey of India) no. 15, 1959 সংখ্যায় “The Rock cut Caves of Pitalkhora in the Deccan প্রবন্ধে E Musicians (পৃঃ ৮৪) পর্যায়ে এর একটির বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন “The instrument, held by a youth against his right shoulder, has seven strings emanating from an elliptical gourd with a curved handle at one end, to which are tied the strings”। যন্ত্রগুলোর আকার মিশরীয় হার্পের মত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাচীন ভারতে শুধু সপ্ততন্ত্রী কেন, সকল রকম বীণার আকারই ছিলো হার্পের মত। পিতলখোরা গুহামন্দিরের তিনটি সপ্ততন্ত্রী বীণার আকৃতিও তাই। বারহুত (খ্রীস্টপূর্ব ২য় শতক), অমরাবতী (খ্রীস্টীয় ২য়-৩য় শতক), গান্ধার (খ্রীস্টীয় ৮ম শতক), বরবুদুর (খ্রীস্টীয় ৮ম শতক), কিজিল (খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতক) প্রভৃতিতে যে বীণার নিদর্শন পাওয়া যায় তাদের আকৃতিও হার্পের মত। এমন কি মুদ্রায় বাদনরত সমুদ্রগুপ্তের প্রতিকৃতিযুক্ত যে বীণার নিদর্শন পাওয়া যায় তার আকারও হার্পের মত।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে প্রায় দশম শতক অর্থাৎ তিন হাজার বছর রাজত্ব করার পর পলিকার্ড উপমহাদেশীয় সংগীত থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায় শুধু থাকে সম্ভর ও সুরমণ্ডল। মনোকর্ড জাতীয় যন্ত্র অর্থাৎ লিউট এবং লিখার জাতীয় বাদ্যযন্ত্র পরবর্তীতে প্রাধাণ্য বিস্তার করে। একটা পুরো সংগীত পদ্ধতি এভাবে পেছনে রয়ে গেল, হার্প ভিত্তিক সংগীত হলো পরিত্যক্ত এবং ‘ফিংগারবোর্ড বীণাকে অবলম্বন করে যে পদ্ধতি গড়ে উঠলো তা পুরাতন সংগীতের স্থান অধিকার করলো।

এই প্রায়-বিপ্লব পরিস্থিতি আমাদের সংগীত ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিবর্তন বলা যায়। লিউট এবং জিয়ার জাতীয় যন্ত্রে একটি তারকে বিভিন্ন পর্দার উপরে অথবা যেখানে পর্দা নাই সেখানে সরাসরি ফিংগারবোর্ডের উপরে তার চেপে অর্থাৎ তারকে থামিয়ে উঁচু এবং নিচু স্বর অর্থাৎ সপ্তকের সব কটি সুর উৎপন্ন করা যায়। ফলে এর চমৎকারিত্বে আকৃষ্ট হয়ে শিল্পী এবং গবেষকগন এই ধরণের আরো বাদ্যযন্ত্র আবিস্কারের নেশায় মেতে ওঠেন, এ ধারণা সহজেই করে নেওয়া যায়।

কালক্রমে জিখারের তুলনায় লিউট জাতীয় যন্ত্র প্রাধান্য বিস্তার করে। এসব লিউটের কোনটা তারে আঙুলের টোকা দিয়ে অথবা প্লেকট্রাম দিয়ে আঘাত করে এবং কোনটা আবার ছড়ের সাহায্যে বাজানোর রীতি প্রচলিত হয়। এভাবে লিউট গোত্রীয় বিভিন্ন যন্ত্রের প্রায় ছড়াছড়ি হয়ে যায়। ফলশ্রুতি হলো নানা ধরণের বাদ্যযন্ত্র, যেমন, তম্বুর, রবার, সুরবাহার, সুরশৃঙ্গার, সেতার, সরোদ, তাউস, দিলরুবা, এসাজ ইত্যাদি।

এই বাদ্যযন্ত্রগুলো তুলনামূলকভাবে আধুনিক। কালের বিবর্তনে এইসব বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে কোন কোনটার প্রচলন কমে আসে। কোন কোটার আবার রূপান্তর ঘটে। নানা রূপান্তর এবং আধুনিকায়নের পর এ ধরণের যে ক’টি বাদ্যযন্ত্র জনপ্রিয়তার সাথে এদেশে টিকে আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সেতার, সরোদ এবং এযান।

আরও দেখুন :

Leave a Comment