সঞ্জীবনী সভার ভূমিকা

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় সঞ্জীবনী সভার ভূমিকা

সঞ্জীবনী সভার ভূমিকা

 

সঞ্জীবনী সভার ভূমিকা

 

সঞ্জীবনী সভার ভূমিকা

জ্যোতিরিন্দ্রনাথের উদ্যোগে সঞ্জীবনী সভা নামে আরেকটি সভা গড়ে উঠেছিলো জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ একে স্বাদেশিকদের সভা বলতেন। এই সভা বসতো কলকাতার এক পোড়োবাড়িতে, ছিলো রহস্যে আবৃত। তাদের কার্যপদ্ধতি ছিলো অদ্ভুত : “দ্বার আমাদের রুদ্ধ, ঘর আমাদের অন্ধকার, দীক্ষা আমাদের ঋমন্ত্রে, কথা আমাদের চুপিচুপি এই রকম রোমহর্ষক সব কাণ্ডই ছিলো সঞ্জীবনী সভার কার্যবিবরণীতে।

তবে স্বাদেশিকতার মূল ভাবনা গোড়াপত্তন ঘটে এই সভায় এবং তা থেকে পরিত্রাণের উপায় সন্ধান ঠাকুরবাড়ির ছেলেদের মাথায় জেঁকে বসেছিল। সভায় প্রতি সদস্যকে বলা হতো সভ্য-যেখানে রবীন্দ্রনাথ ছিলো সর্বকনিষ্ঠ সভ্য এবং সঞ্জীবনী সভার অধ্যক্ষ ছিলেন বিজ্ঞ রাজনারায়ণ বসু। আর এর কার্যক্রম আরম্ভ হতো বেদমন্ত্র পাঠ করে। ভারতের হিত সাধিত হয় এবং কল্যাণ বয়ে আনে এরূপ সকল কার্যসাধনই ছিলো এই সভার লক্ষ্য।

তবে এর সমস্ত কার্যকলাপই ছিলো আশ্চর্য ধরনের ও ব্যতিক্রম। টেবিলের দুইপাশে দুইটি মড়ার মাথা থাকিত, তাহার দুইটি চক্ষু কোটরে দুইটি মোমবাতি বসানো ছিলো। মড়ার মাথাটি মৃত- ভারতের সাংকেতিক চিহ্ন। বাতি দুইটি জ্বালাইবার অর্থ এই যে, মৃত-ভারতের প্রাণসঞ্চার করিতে হইবে ও তাহার জ্ঞানচক্ষু ফুটাইয়া তুলিতে হইবে।

শুধু তাই নয় সভার শুরুতে বেদমন্ত্র গায়নের মাধ্যমে সভার কার্যক্রম আরম্ভ হতো এবং এর কার্যবিবরণী এক অদ্ভুত ধরনের গোপন ভাষায় লেখা হতো, যেই ভাষার উদ্ভাবক ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই সময় থেকেই সংঘবদ্ধতা ও ঐক্যের এক সোপান রবীন্দ্রনাথের মনে স্থাপিত হয়ে যায় এবং স্বদেশপ্রেম মানেই স্বদেশকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরিক সকলপ্রকার জরাজীর্ণতা থেকে মুক্ত করা-এই বিশ্বাসে রবীন্দ্রভাবনা বিকশিত হতে থাকে।

 

সঞ্জীবনী সভার ভূমিকা

 

হিন্দুমেলা ও সঞ্জীবনী সভার কার্যাবলি বালক রবীন্দ্রনাথকে এতো অভিভূত করেছিল যে তিনি ভয়, লজ্জা ও শঙ্কামুক্ত হয়ে অন্য জাত সদস্যদের সাথে স্বদেশমাতৃকা রক্ষার ব্রতে ভাসতে থাকলেন। অতি উৎসাহে তিনি সঞ্জীবনী সভার জন্য জাতীয় সংগীত রচনায় ব্রতী হলেন, যা রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী স্বদেশপর্বের গান।

“ভারত রে, তোর কলঙ্কিত পরমাণুরাশি-

যতদিন না ফেলিবে গ্রাসি ততদিন তুই কাঁদ রে।

রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ১৩ অথবা ১৪ বছর হবার কথা। সেই সময়ে রচিত, প্রায় অনেক গানেই অবহেলিত ও পরাধীন ভারতের দুর্ভাগা মানুষের আকুতির কথা ব্যক্ত হয়েছে, রয়েছে ঐক্যবদ্ধের আহ্বান।

তৎকালীন সময়ের অন্যান্য সকল লেখকের গানের বিষয়বস্তুও প্রায় এই রকমই ছিলো অর্থাৎ দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি প্রসঙ্গে বালক রবীন্দ্রনাথ তার লেখনীর মধ্যদিয়ে তখনই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও অভিনবত্ব প্রকাশ করতে সক্ষম ছিলেন। নিম্নের গানটি এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ –

“অয়ি বিষাদিনী বীণা, আয় সখী,

গা লো সেই সব পুরানো গান।

 

সঞ্জীবনী সভার ভূমিকা

 

এছাড়াও ‘একই সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি প্রাণ’ প্রভৃতি গানের মধ্যে রয়েছে সম্মিলনের আহ্বান। মূলত সঞ্জীবনী সভার কার্যাবলির উদ্দেশ্যকে সফল করবার মানসেই এই সকল গান রচিত হয়েছে, যার মধ্যে অনেক গানই অশ্রুত রয়ে গেছে, আবার কিছু গান এখনো দেশবাসীর মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করে।

আরও দেখুন :

Leave a Comment