অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা

অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা

 

অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা

 

অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বাংলা ভাষাতে বিশ্বমানের বহু উন্নত সাহিত্য রচিত হয়। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে সংগীতে বাংলা ভাষা ও এর গুরুত্ব বিষয়ক আলোচনার রেশ ধরেই বলতে হয়, বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী স্বদেশিযুগের প্রভাব মূলত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও তা সমগ্র দেশবাসীর মনে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আনুগত্যবোধ ও দেশপ্রেম জাগিয়ে এনে দিয়েছে ঐশ্বর্যময় সাহিত্য ও সংগীতের এক অফুরান ভাণ্ডার।

বাংলাদেশ আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরাও এই সাহিত্য ও সংগীতের রস আস্বাদনে লিপ্ত হন। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িকতা বিকশিত হয় এক ইতিবাচক ধারায় যার মূল কেন্দ্রে ছিলো রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ভূমিকা।

মূলত ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথের যে গ্রহণযোগ্যতা ছিলো; বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় বা তারও আগে অর্থাৎ ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত উগ্রসাম্প্রদায়িকতা নিরসনে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশপর্বের প্রাসঙ্গিকতা ছিলো ততটাই যৌক্তিক। ভারতবর্ষের নানা জাতি সম্প্রদায়ের অবস্থান। নানা ঘাতপ্রতিঘাতে স্বদেশ চেতনাবোধটি বিচ্ছিন্ন হলেও তা কখনো নিশ্চিহ্ন হয়নি। এ প্রসঙ্গে শিবাজীর ভারত সাধনা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেন-

“ত ভাল উদ্ভাসিয়া এ ভাবনা তড়িৎ প্রভাব‍

এসেছিল নামি-

এক ধর্ম রাজ্য পাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত

ভারত বেঁধে দিব আমি

রবীন্দ্রনাথ অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধের সম্প্রসারণ করেছেন সর্বত্র। তাই সকল ধর্মের প্রতি তাঁর ঐক্যবদ্ধের আহ্বান ছিলো। তিনি হিন্দু-মুসলিমের ভূ-খণ্ডগত বিভাজনটি মনে-প্রাণে কখনো মেনে নিতে পারতেন না। সমগ্র ভারতবর্ষকে তিনি সকল জাতির নিরাপদ বাসভূমি হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। যেখানে ধর্ম থেকে বাঙালি সত্তার পরিচয়েই সকলে গর্ববোধ করবে বেশি। তাই এ বিষয়ে গভীর ভাবনায় কবি ১৯১১ সালে বলেছেন :

“আজ আমাদের দেশে মুসলমান স্বতন্ত্র থাকিয়া নিজের উন্নতি সাধনের চেষ্টা করিতেছে। তাহা আমাদের পক্ষে যতই অপ্রিয় এবং তাহাতে আমাদের আপাতত যতই অসুবিধা হউক, একদিন পরস্পরের যথার্থ মিলন সাধনের পক্ষে ইহাই প্রকৃত উপায়। ধনী না হইলে দান করা কষ্টকর। মানুষের যতদিন অভাব ও ক্ষুদ্রতা, ততদিনই তাহার ঈর্ষা ও বিরোধ। ততদিন সে আর কাহারো সঙ্গে যদি মেলে তবে দায়ে পড়িয়া মেলে সে মিলন কৃত্রিম।

 

 

Google news
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলিম তথা ধর্ম বিষয়ে সকলের একাত্মবোধের কথা বলেছেন। ধর্ম একটি জাতীয় কর্তব্য ও সুন্দরতম দায়িত্ব যা সকলকে কল্যাণের পথে চালিত করে। ধর্মকে উপজীব্য করে তাঁর যে সকল গান স্বদেশচেতনার সঞ্চার করে তার কতিপয় উদাহরণসহ বিশ্লেষণ করা হলো এই পর্বের আলোচনায়। একটি দেশকে ভালোবাসা মানে সেই দেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ধর্মকে ভালোবাসা।

স্বদেশপর্বের ‘জনগণমন অধিনায়ক’ এই বিখ্যাত গানটিতে তেমনি কবি হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসিক, মুসলমান ও খ্রিষ্টানসহ সকল ধর্মের জয়গান গেয়েছেন । হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে গানটিতে ভারতের মহামানবের সাগরতীরে সকলকে আহ্বান করেছেন। আর্য, অনার্য, হিন্দু-মুসলমান এমনকি ইংরেজ, খ্রিষ্টান, ব্রাহ্মণ, পণ্ডিত সকলকে আহ্বান করেছেন এই গানে।

ভারতবর্ষের মঙ্গলঘট ভরতে ভারতবর্ষের সকল জাতির পবিত্র পরশের প্রয়োজন। এই উক্তির মধ্যদিয়ে কবি অসাম্প্রদায়িক এক মানবতাবাদী চেতনার বাণী ব্যক্ত করেছেন তাঁর স্বদেশপর্বের গানের । কবি তাঁর গানে ধর্মকে অনির্বাণ আলো বলে চিহ্নিত করেছেন। স্বদেশকে ভালোবাসা মানে সে দেশের ধর্মকেও ভালোবাসা। ধর্মের আলোকে সবার ঊর্ধ্বে জ্বেলে সংকটে দুর্দিনে সম্মুখে এগুতে হবে।

যার যার ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রেখেই স্বদেশের সেবায় নিজেকে নিবেদন করতে বলেছেন কবি। ধর্ম- কর্ম বিবর্জিত হলে মানুষ লক্ষ স্থির করতে পারে না। স্বদেশের মুক্তির জন্য যে কঠিন তপস্যা ও সত্য সাধনার প্রয়োজন তা কেবল অর্জিত হতে পারে ধর্মের পথে ব্রতী হলে। ‘নাহি পৌরুষ, নাহি বিচারণা, কঠিন তপস্যা, সত্যসাধনা – / অন্তরে বাহিরে ধর্মে কর্মে সকলই ব্রহ্মবিবর্জিত হে ॥

রবীন্দ্রনাথ তাঁর বহু স্বদেশচেতনার গানে নিজ ধর্মকে আশ্রয় করে সম্মুখে এগুবার আশা ব্যক্ত করেছেন। যেকোনো ধর্মই মানুষকে সংকল্পে অটল রাখে। তাই স্বদেশপ্রেমের চেতনায় স্ব স্ব ধর্মদীক্ষা সহায়ক হয়। জাতীয় সংগীত বিভাগের অন্তর্গত কিছু গানেও কবি স্বদেশের ধর্মের স্তুতি বন্দনা করেছেন।

দেশমাতা যেমন আমাদেরকে তার স্বর্ণশস্য দেন, তেমনি ধর্ম, জ্ঞান ও বহুবিধ পুণ্য কাহিনিতেও আমাদের সমৃদ্ধ করেন। ‘তুমি তো দিতেছ মা, যা আছে তোমারি- স্বর্ণশস্য তব, জাহ্নবীবারি, জ্ঞান ও ধর্ম কত পুণ্যকাহিনী । নতুন বছরে কবি স্বদেশের দীক্ষা লাভের, শিক্ষা লাভের পণ করেছেন । পরের ভূষণ, পরের বসন ভিক্ষাবৃত্তি সমান।

কবি তা ত্যাগ করতে যেমন পণ করেছেন তেমনি স্বদেশের ধর্ম, কর্ম ও স্বদেশ ভক্তির যে মন্ত্রবাণী অন্তরে লালনের গৌরব, সেই গৌরবের দীক্ষা দিতে চেয়েছেন নতুন বছরে।

“নব বৎসরে করিলাম পণ লব স্বদেশের দীক্ষা-

তব আশ্রমে তোমার চরণে, হে ভারত, লব শিক্ষা।

ধর্ম কবির কাছে দেশ সেবার একটি পন্থা। সকল ধর্ম কল্যাণকামী। প্রকৃত ধর্ম সর্বদা দেশমাতার কল্যাণে নিজেকে বিলীন হতে শেখায়। তাই কবির স্বদেশচেতনার মানদণ্ডে তাঁর গানে ধর্মের অস্তিত্ব প্রতিভাত হয় বারংবার। শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ধর্মের ভিন্নতা থাকতে পারে; কিন্তু মতের বিরোধ যেন না থাকে। স্বদেশের সেবায় সকল ধর্মের সকলকে পথে নামতে হবে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই ছন্দে পথ চলতে হবে, তা সে যেই হোক না কেন।

 

অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা

 

বাংলা তথা বাঙালিয়ানাই তার প্রধানতম পরিচয়। ধনী, গরিব সবাই এখানে সমান। তাই কবি স্বদেশমাতার সংকটাপন্ন অবস্থায় হিন্দু-মুসলিম সকলকে আহ্বান করেছেন। সকল কাজ ফেলে কেবল দেশমাতার সেবাই মুখ্যতম কাজ বলে কবি সবাইকে দুয়ার খুলে বাইরে বের হতে বলেছেন, পেছনের কর্মের সকল ভাবনা ভুলে। তিনি সকল পিছুটানের ডাককে তুচ্ছ করে স্বদেশমাতার ডাকে পথে নামতে বলেছেন। স্বদেশমাতার সম্মান বাঁচলে প্রতিটি মা বাঁচবে, ঘর বাঁচবে বাঁচবে মানব অস্তিত্ব।

আরও দেখুন :

Leave a Comment