দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্বদেশি গানের সুর বিশ্লেষণ

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্বদেশি গানের সুর বিশ্লেষণ। বাংলা সংগীতকে আধুনিকতার অবয়বে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। পিতা কার্তিকেয়চন্দ্র রায় ছিলেন উনিশ শতকের প্রখ্যাত কালোয়াত এবং সুকণ্ঠ গায়ক। পিতার সাংগীতিক গুণাবলি তাঁর রক্তে সঞ্চারিত হয়েছিল। ফলে অল্প বয়সেই তিনি মৌলিক গান রচনায় কৃতিত্ব দেখান। ১৮৮২ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে একশো আটটি গান নিয়ে তার গীতিসংকলন ‘আর্যগাথা প্রথম ভাগ’ বের হয়।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্বদেশি গানের সুর বিশ্লেষণ

 

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

 

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্বদেশি গানের সুর বিশ্লেষণ

অভিজাত পরিবারের সাহিত্য ও সংগীত পরিমণ্ডলে গড়ে উঠেছিল দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সাহিত্যসভা। খেয়াল গায়ক অন্ধ শরৎ ও সুরেন মজুমদারের সান্নিধ্যে প্রাচ্য সংগীত তথা রাগ-রাগিণীর মধ্যদিয়ে তাঁর সাংগীতিক ধ্যানধারণা গড়ে ওঠে যেমন, ঠিক তেমনি বিলেতে পড়তে যাওয়ার সুবাদে সুযোগ পান ক্ষচ্ আইরিশ ও ইংরেজি গানের সুরধারায় নিজেকে পরিপূর্ণ করতে।

দেশীয় লোকসুর কীর্তন-বাউলের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে। তাঁর রচিত স্বদেশপর্বের গানের সুর রচনাতেও এই সকল অভিজ্ঞতার ছাপ পরিলক্ষিত তাঁর গানে। এ প্রসঙ্গে স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন-

“তিনি বুঝেছিলেন যে, গানকে বড় হতে গেলে তার মধ্যে সুরবিহারের (Improvisation) পাখা মেলবার অবকাশ রাখতে হবে। কথার চাপে তার টুটি টিপে ধরলে সে সর্বোত্তম গানের পর্যায়ে পড়বে না। বাংলাগানে সুরকে লীলায়িত করবার অবকাশ দিয়ে তবে সুর রচনা করতে হবে।… সেইখানেই গানের শ্রেষ্ঠ বিকাশ, যেখানে গানের কাব্য সুরকে পাখা মেলতে দিয়েছে।

তিনিও তাঁর গানের সুর রচনায় রবীন্দ্রনাথের মতো কাওয়ালি, খেমটা খেয়ালাঙ্গের রাগরূপে চৌতাল, একতাল, যৎ, আড়া, ঝাঁপতাল, ত্রিতাল প্রভৃতি তালের ব্যবহার করেছেন। আবার রাগ-রাগিণী নির্বাচনেও প্রধানত ঝিঁঝিট, খাম্বাজ, ছায়ানট, বিবিধ খাম্বাজ, মিশ্র সিদ্ধ খাম্বাজ, সুরট খাম্বাজ, মিশ্র ভূপালি, কালাংড়া, গৌড় সারং ইত্যাদি সুরকে বেছে নিয়েছেন।

তবে স্বদেশপর্বের গানের বেলায় খাম্বাজ, ঝিঁঝিট ও ভৈরবী-এই তিনটি রাগের বেশি উল্লেখ পাওয়া যায় তাঁর গানে। রাজ্যেশ্বর মিত্রের মতে, ‘রাগসংগীতে দ্বিজেন্দ্রলাল যে সমস্ত গান রচনা করেছেন, তার অনুশীলন করলে দেখা যায়, খাম্বাজ, ঝিঁঝিট এবং ভৈরবী তাঁর সবচেয়ে প্রিয় রাগ ছিলো।

আমরা জানি, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রবীন্দ্রনাথের মতোই তাঁর গানে বিদেশি সুরের অতি নিপুণ ও যথার্থ প্রয়োগ করেছেন, যা তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত প্রশংসনীয় হয়ে ওঠে। তবে রবীন্দ্রনাথ বিলেত থেকে ফেরার পর যেভাবে বিদেশি সুরের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন পরে তার রেশ পুরোপুরি বদলে যায় অর্থাৎ বিলেত থেকে ফেরার পর কতিপয় গীতিনাট্যে বা নৃত্যনাট্যে বা গানে বিদেশি সুরের প্রয়োগ করেন।

পরবর্তী সময়ে তেমনভাবে আর এ সুর তিনি গ্রহণ করেননি। কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলাল এদিক থেকে ব্যতিক্রম। তিনি বিলেত থেকে ফেরার পর বিদেশি সুরের অভিজ্ঞতার ছাপ তাঁর পরবর্তী জীবনের বাকিটা সময় জুড়ে ছিলো। তবে বিদেশি সুরের ঢংটিকে তিনি তাঁর গানে বিশেষত স্বদেশপর্যায়ের গানে ব্যবহার করেন খুবই নিপুণ ও সংযতভঙ্গিতে।

বিলেতি সুরের লাফিয়ে চলার ধরনটি দ্বিজেন্দ্রলালের বহু স্বদেশি গানের সুরে পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ কবি বিশ্বাস করতেন, মীড়যুক্ত সুরের থেকে খাড়া খাড়া সুরে স্বদেশি গানের বাণী বেশি স্পষ্টতা পায়। স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে-

“ইংরাজী গানে স্বরগুলি সব সোজা সোজা, একটা স্বরের উপরে আর একটার নির্ভর নাই। প্রতিস্বর স্পষ্ট এবং স্বাধীন….. ইংরাজী গানের আবার যেরূপ ভাবের বৈচিত্র্য আছে, হিন্দু, সংগীতে তাহা নাই। কি করুণ, কি প্রেম, কি কি বীর, সব রসই ইংরাজী গানে হাস্য, আছে।

ইংরাজী সুর ধুমকেতুর মত কোথা হইতে আসিয়া চলিয়া যায়, তাহার ঠিকানা নাই, যেন, হাউয়ের মত একেবারে ঊর্ধ্বে উঠিয়া চলিয়া যায়……. বাঙালী সঙ্গীতাদি একস্থানে শুইয়া মনে মনে স্বপ্নরাজ্য সৃষ্টি করে। ইংরাজী সংগীতাদি যেন পাইন বৃক্ষের ন্যায় সোজা সংযত নিয়মিত।… ইংরাজী গানে সংযমের ভাব আছে, যাহা হিন্দুগানে নাই, একটি ঊর্ধ্বমীলনোন্মুখ, অপরটি অর্ধনিমীলিত।

একটি জাগরণ, অপরটি তন্দ্রা, অপরটি সন্ধ্যা…… একটি দিবা, একটি যেন প্রভাব আকাশে উড্ডীন স্বরসুধাবর্ষী পাপিয়া, অপরটি যেন নিভৃত নিকুঞ্জে কলকণ্ঠ কোকিল; একটি আশাময়ী, উন্মুখী সূর্যমুখী, অপরটি সভয়া, বিনতনয়না অপরাজিতা। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানে রাগ-রাগিণীর প্রতি গভীর প্রেমকে আলাদা সম্মান জানাতেই হবে।

এবং তাঁর অন্যান্য পর্যায়ের গানে ভারতীর রাগ-রাগিণীর প্রয়োগকালে কৰি উপলব্ধি করলেন কিছু রাগ-রাগিণীর ওঠানামার মধ্যেও বিদেশি সুরের ওঠানামার ধরনের সামঞ্জস্যতা দেখা যায়। সরল এবং তুলনামূলকভাবে সহজ ছন্দের তালে আবদ্ধ রাগের মধ্যে কবি এই লক্ষণ খুঁজে পান। যেমন ঝিঁঝিট, খাম্বাজ, সুরট খাম্বাজ প্রভৃতিতে সুরের ওঠানামতে বিদেশি সুরের লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়।

Google news
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

কবি তখন এই সকল রাগ-রাগিণীর সাথে বিদেশি সুরের সংমিশ্রণে এক প্রকার নিজস্ব স্বতন্ত্র ও অভিনব পন্থা গড়ে তোলেন। যে পন্থায় রাগ-রাগিণী এর নিজস্ব সত্তাটি বজায় রেখে চলে ঠিক তেমনি ইংরেজি গানে সুরের লাফিয়ে চলার সুরগত বৈশিষ্ট্যও একই ধারায় রক্ষা পায়। নিজের একান্ত সৃষ্ট সুরের স্টাইলে কবির রচিত গানগুলো পায় এক ভিন্ন মাত্রা। সকলের কাছে এর বিপুল গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে।

দ্বিজেন্দ্রলালের স্বদেশি গান আজও ঠিক ততটাই আধুনিক ও হৃদয়গ্রাহী। তাঁর স্বদেশি গানের বাণীর গভীরতা ও সুরের সরলতায় গানগুলো সকলের গান হয়ে উঠেছিল এবং আজও তাই হয়ে আছে। যে যেই গানেই পারদর্শী হোক না কেন দ্বিজেন্দ্রলালের ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ গানটি শুনলে সকল বাঙালির হৃদয়ে স্বদেশের প্রতি এক অদ্ভুত আকুলতা তৈরি হয়।

মিশ্র রাগের সাথে বিদেশি সুরের ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’তে বিদেশি সুরের ওঠানামার চলনটি রক্তে এক উন্মাদনা তৈরি করে। তাঁর স্বদেশের প্রতি নিবেদিত প্রতিটি সরল উক্তিতে দেশমাতার যে ছবি ভেসে ওঠে তাতে বিদেশি সুরের সরল প্রয়োগ গানের প্রতিটি শব্দকে দৃশ্যে পরিণত করে। এই অভিনব সুরভাবনা ও এর প্রয়োগ তাঁকে অনন্য এক কৃতিত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝানো হলো-

ধন্যধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা

তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা,

স্বপ্ন দিয়ে তৈরী সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা।

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,

সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি ”

 

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্বদেশি গানের সুর বিশ্লেষণ

 

এই গানটির পাশ্চাত্য সুর, উচ্ছলতা ও গতিবেগ অন্য এক অভিনবত্ব এনে দেয়। এ প্রসঙ্গে দিলীপকুমার রায় লিখেছেন,
“প্রাণশক্তির চমক পেতেন বলে… নানা স্বদেশী গানেই তিনি এনেছিলেন এই সুরের টপকে টপকে চলা।

‘সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি তে জন প্রথমবার মুদারার মা থেকে লাফ দিয়ে পৌঁছল ছটা সুর ডিঙিয়ে তারার রে-তে দ্বিতীয় ‘সে যে আমার জন্মভূমির জনম্ গাওয়া হ’ল মুদারার কোমল নি-তে কিন্তু তারপরেই তুমি মাটি নিল রেখাবে ফিরে পাঁচটা পর্দা এক লাফে নেমে …এ বৈদেশিকী গতিলীলা তিনি শুধু যে তাঁর স্বদেশী গানেই প্রবর্তন করেছেন তা নয় তাঁর অন্য অনেক গানেও এ চাল পরিস্ফুট হয়েছে।

কবি দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর স্বদেশের গানে ব্যবহৃত রাগ-রাগিণীর মধ্যে ইমন, ভূপালি ও কেদারকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। হয়তো এই রাগসমূহের একটি স্বর থেকে অন্য স্বরে যাওয়ার রীতিটি বিদেশি সুরের চলার গতির মতো অর্থাৎ সুরের ওঠানামাতে বিদেশি সুরের চলার পদ্ধতিটি পরিলক্ষিত হয়। ইমন- নি ধা পা ক্ষা গা রে, রে গা মা রে নি রে সা (উভয় মা ব্যবহৃত ও নি প্রবল)।

ভূপালি- সা রে গা পা ধা সা ধা পা গা পা ধা পা গা রে সা (মা বর্জিত বা প্রবল)। কেদার- সা মা, মা গা, পা, হ্মা পা ধা মা গা পা ধা র্সা (উভয় মা ব্যবহৃত ও মা প্রবল)। তাঁর অধিকাংশ স্বদেশি গানে এই রাগগুলোর ব্যবহার করেছেন। যদিও গানগুলো শুনবার সময় কোনো রাগের লক্ষণ বিশেষত পরিলক্ষিত হবে না, বা উপলব্ধি হওয়া কঠিন। ছোটবেলা থেকে বাবার কাছে হিন্দুস্থানী গান শিখলেও কবি কখনোই হুবহু অনুকরণের পক্ষে ছিলেন না।

যেকোনো রাগই কবি নিজস্ব ছোঁয়ায় তার রূপ পাল্টে এক নতুন রূপে উপস্থাপন করতেন তাঁর গানে। এক্ষেত্রে স্বরলিপি অনুসারে আলাহিয়া-বিলাবলের সুরের সম্মিলনে সৃষ্ট সুরের অনুপ্রেরণায় রচিত গান ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ এর উল্লেখ প্রাসঙ্গিক। কারণ এই গানটি কবির অত্যন্ত প্রিয় একটি স্বদেশপ্রেমের গান যা মূলত সম্মেলক গান হিসেবে অধিক প্রচলিত। একতালের ত্রিমাত্রিক ছন্দের এই গানটির স্বরলিপি তুলে দেওয়া হলো,

“বঙ্গ আমার। জননী আমার!

ধাত্রী আমার। আমার দেশ,

কেন গো মা তার শুষ্ক নয়ন

কেন গো মা তোর রুক্ষ কেশ!”

(আলাহিয়া-বিলাবল-ত্রিমাত্রিক)

 

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্বদেশি গানের সুর বিশ্লেষণ

 

লক্ষণীয় যে, আলাহিয়া বিলাবলের আরোহন-অবরোহন বক্ররূপে গাওয়ার রীতিই প্রচলিত। এর বিশেষ কিছু স্বরসংগতি রয়েছে। যেমন- ‘ধা পা ধা পা সা না ধাণা পা মা গা মা রা, গা পা মা গা মা রা সা’ প্রভৃতি। উক্ত গানের ‘কেন গো মা তোর’ ও ‘কিসের লজ্জা কিসের ক্লেশ ‘ অংশটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আলাহিয়া বিলাবলের দুটি স্বরসংগতি ‘ধা ণা ধা পা’ ও ‘গা পা মা গা মা রা সা’ সম্পূর্ণ রূপে মেনে চলছে।

এই গানটিতে কবি শত কোটি সন্তানের জননী ভারতমাতার স্তুতি বন্দনা করেছেন। এই রকম বহু স্বদেশি গানে বিদেশি সুরের সাথে দেশীয় রাগ-রাগিণী মিশ্রণের অভিনব পদ্ধতিটি পরিলক্ষিত হয় তাঁর
গানে। যেমন-

১. ধাও ধাও সমর ক্ষেত্রে লঘুছন্দ-একতাল।

২. ভারত আমার ভারত আমার-ইমন-ভূপালি-একতাল।

৩. আজি গো মা তোমায় বরণে-ইমন কল্যাণ-একতাল।

৪. সেথা গিয়েছেন তিনি সমরে ইমন-একতাল।

গান দুটি রাগসংগীতে বিদেশি সুরের প্রয়োগ ছাড়াও কবি তাঁর স্বদেশপর্বের গানের নিজ ভূমির নিজস্ব সুর অর্থাৎ বাউল-কীর্তনের সুরকে গ্রহণ করেছেন আপন মমতায়। স্বদেশের জন্য আন্দোলন অবশ্যই স্বদেশের নিজস্ব সকল সুরের গানেই সম্ভব। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ যেমন সহজ সরল মাটির সুরে স্বদেশপর্যায়ের গান রচনা করেছেন, তেমনি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ও।

কীর্তন, বাউল, সারি ও রামপ্রসাদীর মতো বাঙালির চিরচেনা সুরকেই কবি বেছে নিয়েছেন স্বদেশের মর্মবাণীকে উপস্থাপনের জন্য। কারণ রাগ-রাগিণীর কালোয়াতিতে অনেক সহজ কথাও কঠিন হয়ে যায়। তাই স্বদেশের প্রতি সরল, নিখুঁত ভালোবাসাকে কবি প্রকাশ করেছেন সরল সুরের সহজ ভঙ্গিমায়। যে সুর বুঝতে পারা ও গাইতে পারা উভয়ই সাধারণের জন্য খুব সহজ।

কীর্তন-বাউলের নিজ সুর সকল বাঙালির হৃদয়ে গাঁথা। তাই কবির অনেক স্বদেশের গানে কীর্তন-বাউলের সুর পরিলক্ষিত হয়। স্বরলিপির উদাহরণে বিষয়টি বোঝানো সহজ। যেমন-

একবার – গালভরা মা ডাকে মা ব’লে ডাক মা ব’লে ডাক্‌ মা ব’লে ডাক মাকে

ডাক্‌ – এমনি ক’রে আকাশ ভুবন সেই ডাকে যাক ভরে

আর – ভায়ে ভায়ে এক হ’য়ে যাক যেখানে যে থাকে

দু’টি – বাহু তুলে নৃত্য ক’রে ডাক্ রে মা মা ব’লে

 

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্বদেশি গানের সুর বিশ্লেষণ

 

এই সকল গানের সুর সমন্বরে গাইবার উপযোগী। মানুষের মনে স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্ষেপণে ও স্বদেশের প্রতি গভীর আবেগ প্রকাশে কবি হৃদয়ের চিরচেনা সুরকে বাউল-কীর্তনের সুরে বেছে নিয়েছেন। দেশপ্রেমের বা ভক্তিরসের গানের সুরসৃষ্টিতে দ্বিজেন্দ্রলাল কীর্তন ও বাউলের সহজ সুরের উদাত্ত আবেগকে গ্রহণ করেছেন। এই গানগুলি মানুষের অন্তর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মূর্ছিত হবে, এটাই কাম্য।

কোরাস বা সমবেত কণ্ঠে গাইবার রীতিটিও দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রবর্তন করেন। কোরাস রীতিটি মূলত ছিলো বিলেতি একটি পন্থা। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ই প্রথম বাংলা আধুনিক গানে এ ধারার সন্নিবেশ করেন। স্বদেশপর্বের গানে এই কোরাস রীতি গানের উচ্চতা ও আত্মিক চঞ্চলতা অনেকাংশে বৃদ্ধি করে। স্বদেশের প্রতি নিবেদিত কোনো লাইন যখন সমস্বরে বহুজনে গায় তখন একটি শপথ বাণীর মতোই উচ্চারিত হয়।

কোরাস গানের এই রীতির প্রবর্তন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে স্বদেশপর্বের গানের ক্ষেত্রে চির বরণীয় ও স্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর নবধারার সংগীত প্রতিভার বিষয়ে দিলীপকুমার রায় লিখেছেন,

“কোরাস গানে তাঁর তুল্য শক্তিমত্তা অদ্যাবধি কেউ প্রকাশ করতে পারেনি কারণ তাঁর সুর রচনার ভঙ্গি, প্রাণের উৎসাহ, আনন্দের পৌরুষ ছিলো আশ্চর্য অদ্বিতীয়। যাঁরা সে সময়ে তাঁর শেখানো দলের ব্যুহাগ্রে “বঙ্গ আমার জননী আমার” গান তাঁর মুখে শুনেছেন (আমরাও প্রায়ই থাকতাম এ কোরাসে) তাঁরা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করতেন যে তাঁর গানের কথা ও সুরের সংমিশ্রণে যে আগুন জ্ব’লে উঠত সে আগুন আর কোনো বাংলা গানেই জ্বলে ওঠে নি তখন পর্যন্ত।

দিলীপকুমারের বর্ণনায় আরো পাই যে, কোরাস সংগীত মানে একটি আলাদা সাংগেতিক বৈশিষ্ট্যের আবহ সৃষ্টি, যা সকল শ্রেণির শ্রোতার ভাবকে আন্দোলিত করে। যা সমষ্টিগত শুভ প্রত্যাশা পূরণে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

“যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ,

উঠিল বিশ্বে সে কী কলরব, সে কী মা ভক্তি সে কী মা হর্ষ ।।

সেদিন তোমার প্রভায় ধরার প্রভাত হইল গভীর রাত্রি।

বন্দিল সবে “জয় মা জননি জগত্তারিনি জগদ্ধাত্রি!”..

শীর্ষে অভ্র তুষার-কিরীট সাগর ঊর্মি ঘেরিয়া জঙ্গা !

বক্ষে দুলিছে মুক্তার হার পঞ্চসিন্ধু যমুনা গঙ্গা!

কখনো মা তুমি ভীষণ দীপ্ত তপ্ত মরুর উষর দৃশ্যে

হাসিয়া কখন শ্যামল শস্যে ছড়ায়ে পড়িছে নিখিল বিশ্বে।

এ জাতীয় কোরাস বা সমবেত সংগীতকে জাতীয় জীবনে শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি সম্পদ বলা যেতে পারে যা সুরে, ছন্দে, কাব্যে ও চিত্রাঙ্কনে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখে।

 

আরও দেখুন :

Leave a Comment