হাসির উপমায় স্বদেশ

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় হাসির উপমায় স্বদেশ

হাসির উপমায় স্বদেশ

 

হাসির উপমায় স্বদেশ

 

হাসির উপমায় স্বদেশ

পরাধীন দেশবাসী তথা জননীর বেদনার চিত্র দ্বিজেন্দ্রলালকে আহত করতো, আকুল করতো। সেই ভাবনাই তাঁর রচিত দেশপর্বের গানগুলোর মধ্যে বিস্তৃতভাবে ধরা পড়েছে এবং যে কারণে এই পর্বের গানগুলো জনমনে বিশেষ সমাদর পেয়েছে।

দেশমাতৃকার প্রতি প্রেমবোধ ছাড়াও মানুষের পারস্পরিক হিংসা-প্রতিহিংসা, নীতিবিহীন বিচার-বিবেচনাবোধ, মানুষের আত্মিক ও বাহ্যিক রূপের বিশাল ব্যবধান—এই বিষয়গুলোও তাঁকে ভাবাতো। তাঁর গান ও কবিতায় তা প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে। স্বদেশপর্বের গান ছাড়াও তাঁর রচিত হাসির গান এসবের ইঙ্গিতবাহী দিকের নিদের্শনা দেয়।

হাস্যরসের মধ্যদিয়ে জীবনের কঠিনতর সত্যকে তিনি ব্যক্ত করেছেন নিপুণ পারদর্শিতায়। বাঙালিকে ভাবানোই ছিলো তাঁর মূল লক্ষ্য। ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় ও সামাজিক আচার বিষয়ের সংকীর্ণতা এবং পরাধীন ভারতবর্ষের সাহেবী চাল, অথচ মুখে স্বদেশি বুলি-এসবের তীব্র বিরোধিতা করতে তিনি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সে কারণেই সৃষ্টির ছোঁয়া পায় তাঁর হাসির গানের এক বিশাল ভাণ্ডার।

তাঁর হাসির গানের মূল বিষয় মূলত সমাজের অসংগতি, ভণ্ডামি ও মিথ্যাচার যা তিনি কিছুতেই সহ্য করতে পারতেন না। তাই হাসির এই ইঙ্গিতবাহী গানের মধ্যদিয়ে তিনি মূলত স্বদেশের প্রতি, স্বদেশের মানুষের প্রতি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সাময়িক পত্রে মধ্যে মধ্যে ‘আষাঢ়ে’ রচয়িতার এমন সকল কবিতা বাহির হইয়াছে, যাহাতে হাস্য এবং অশ্রুরেখা, কৌতুক এবং কল্পনা, উপরিতলের ফেনপুঞ্জ এবং নিম্নতলের গভীরতা একত্র প্রকাশ পাইয়াছে।

তাহাই তাঁহার কবিত্বের যথার্থ পরিচয়। তিনি যে সকল বাঙালিকে হাসাইবার জন্য আসেন নাই, সেই সঙ্গে তাহাদিগকে যে ভাবাইবেন এবং মাতাইবেন এমন আশ্বাস দিয়াছেন। এ মন্তব্যের মধ্যদিয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের হাসির গানের একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। প্রথাসর্বস্ব আচার-বিচার, ভারতবাসীর সংকীর্ণ মনোভাব, সাহেবী গানের প্রতি মোহ এবং আত্মসিদ্ধি লাভের আশায় দাসত্ব বরণ তাঁকে বেদনার্ত করতো।

দেশপ্রেমী দ্বিজেন্দ্রলাল এই সকল বেদনার প্রত্যুত্তর দিয়েছেন কঠিন বিদ্রূপের সাথে তাঁর হাসির গানের মধ্যদিয়ে। স্বদেশচেতনার এক অন্যরকম বহিঃপ্রকাশ যেন এই সকল গান। হাসতে হাসতে জীবনে কঠিনতর সত্যকে, দেশমাতার প্রতি দায়িত্বের বাণীকে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন এই সকল গানে।

 

হাসির উপমায় স্বদেশ

 

“জয় জয় মোঘল ব্যঘ্র মোঘল ব্যাঘ্র

বলে জোরে ডঙ্কা বাজাই।

সাধে কি বাবা বলি

গুঁতোর চোটে বাবা বলায়।”

রূপক সাংকেতিকতায় এই গানের মধ্যদিয়ে তিনি এই দেশবাসীরই হীনমন্য ও দৈন্যদশার কথা ব্যক্ত করেছেন। মোঘল, ইংরেজ যতই আমরা পূজি, সামান্য ভুলে যে কোনো সময় গলায় ফাঁসি পড়বে। এর কারণ আমরা পরাধীন। এ ভক্তি সকলই প্রাণের দায়ে। এই সকল ব্যঙ্গানুকৃতি গানের ভেতর দিয়ে দেশমাতার সন্তানদের হীনদশার কথা কবি তুলে ধরেছেন। হাস্যরসের মধ্যদিয়ে অন্তরাত্মাকে জাগাতে চেয়েছেন তিনি।

“ছেড়ে দলাদলি, কর গলাগলি

ছেড়ে রেষারেষি, কর মেলামেশি

ছেড়ে ঢাকাঢাকি, কর মাখামাখি।

এইছিলো কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জীবনের ভাবনা। তিনি খুব কঠিন, জটিলভাবে জীবনকে দেখতে প্রস্তুত ছিলেন না। হাস্যরসের মধ্যদিয়ে যেমন তিনি নিজে বাঁচতে চেয়েছেন তেমনি অন্যকেও আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করতেন। তিনি দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন।

তাই ‘বিলাভ ফেরত ক ভাই’, ‘Reformed Hindus’ ও ‘ক’টি নবকুলকামিনী’ প্রভৃতি গান-কবিতার মধ্যদিয়ে হাসির ছলে দেশমাতার সন্তানদের তাদের কৃতকর্মের জন্য কটাক্ষ করতে ছাড়তেন না। শুধু তাই নয়, কবি দ্বিজেন্দ্রলাল ছিলেন ধর্মে নিষ্ঠ। তাই দেশীয় আচারে অনিষ্ঠ সাধক, ভণ্ড ও মিথ্যাচারী স্বজাতি ভ্রাতাদের তিনি আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করতে চাইতেন। ভালো আর মন্দের ব্যবধান তিনি হাসির ছলে, কটাক্ষের ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিতে চাইতেন।

 

Google news
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

 

একজন দেশপ্রেমী, দেশানুরাগী কবির ছিলো স্থির সমাজের সাথে লড়াই । সমকালীন দেশাচারের ত্রুটি-বিচ্যুতির তীব্র প্রতিবাদ করেছেন হাস্যরসের ছলনায় অত্যন্ত নগ্নভাবে। খুব সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী কবির পক্ষেই এহেন সাহসী ও বলিষ্ঠ বাণী ব্যক্ত করা সম্ভব। আর স্বদেশি আন্দোলনের উত্তাল সময়ে এই কাজটি একাই সাধন করেছিলেন তিনি।

আরও দেখুন :

Leave a Comment