কানাইলাল শীল সাংস্কৃতিক অঙ্কনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই মহান পুরুষের জন্ম হয়েছিল বলেই বাংলাদেশে লোক সংগীতের এক যুগান্তকারী অধ্যায় রচনা করে গিয়েছেন। কবি জসীমউদ্দীনের মতো প্রতিভা, আব্বাস উদ্দীনের মতন আলৌকিক কণ্ঠস্বরের অধিকারী জননন্দিত গায়ক, কাজী নজরুল ইসলামের মত উপনিবেশিক চির বিদ্রোহী কবি ব্যক্তিত্ব ও এককালে দোতারার ধারি কিশোর কানাই লাল শীলকে নিয়ে কারাকারি করেছিলেন।

দোতারার মুকুটহীন সম্রাট কানাইলাল শীল
দোতারা মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন কানাইলাল শীল। তার নমনীয় আঙ্গুলি এবং হাত দুটি সপিল ভঙ্গিতে দোতারায় মনোহরিণী সুর লহরী সৃষ্টি করতেন। তার শান্ত লম্বাটে মুখ মন্ডলে ফিল সমাহিত ভাবে এবং স্নিগ্ধ হাসিতে সদ্য উদ্ভাসিত থাকতো। তার আত্মার গভীরে সুরের আগ্নেয়গিরি প্রজ্বলিত ছিল। কিন্তু তার বিন্দুমাত্র প্রকাশ ছিল না। কিন্তু যখন তিনি একটি তার যন্ত্র তার দোতারাটি হাতে তুলে নিতেন, তিনি একজন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষের রূপান্তরিত হয়ে যেতেন।
বাংলা ১৩০২ সন অগ্রহায়ণ মাসে ইংরেজি ১৮৯৫ ফরিদপুরে কইরাল গ্রামে কানাই লাল শীলের জন্ম। আনন্দ চন্দ্র শীল তার পিতার নাম। ছিলেন সৌদামনী। সংগীতের প্রতি তীব্র ভালোবাসা ছিল কানাই লাল শীলের। সংগীতের প্রতি আবেদন তিনি পেয়েছিলেন পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে মাত্র আড়াই বছর বয়সে তিনি পিতৃ হারা হন। পিতার মৃত্যুর পর তার মা ও কাকিমা কানাই লাল শীলকে প্রতি পালন করেছেন। মাত্র ৮ বছর বয়সে নগরকান্দা এলাকায় খ্যাতনামা বেহালা বাদক শ্রী বসন্ত কুমার শীলের কাছে হাতে খড়ি। বসন্ত শীল কানাইয়ের বেহালা উপর অর্জন করা হস্ত সঞ্চালন দেখেই সহজে বুঝেছিলেন এই হাত বহু হৃদয় কে স্পর্শ করবে।
তিন বছর গুরু বসন্ত শীল ছাত্রকে উজার করে ঢেলে দিলেন। ১১ বছর বয়সে কানাইলাল শীলবসন্ত শীলে গুরু মতিলাল ধৃপীয় কাছে বেহালার পূর্ণ্য পাঠ নিতে শুরু করেন। এরপর তিনি কবিগান ও গাজী গান কতিপনা কীর্তন ব্যান্ড দলে যোগ দিয়ে এক একটি অঞ্চল সফর করে বেড়ালেন।
সংগীত শিল্পীদের কাছে তিনি জীপসী রাজা হিসেবে পরিচিত হলেন। তার পেশাগত কৃতিত্বে সকলেই তাকে আপন করে নিয়ে ছিলেন। যদিও কানাই লাল শীল ছিলেন প্রকৃতি গত ভাবে জন্ম যাযাবর। বাংলার লোক সংগীতের বিচরণ উদার ভ্রমন কানাই লাল শীলের জীবনকে অনেক অপরিহার্য অভিজ্ঞতায় পূর্ণ করে দেয়। স্বদেশ ও প্রজাতিকে তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতেন। এ সময়ে কানাই লাল শীলের জীবনে আধ্যাত্মিক আলোর ঝলক লাগে।
তিনি গিয়েছিলেন বিক্রমপুর এর কাছে বৈমাহাটি ফকির দরবেশ দিপু সাহেব মার্জার দর্শন করেন। এখানে এসে তিনি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি দেখতে পান কাফনে পড়ানো একটি লোক বসে দোতারা বাজাচ্ছে।। এই সুরধ্বনি কোন সাধারণ ধ্বনি ছিলো না। এ ছিল স্বর্গীয় সুরমূর্ছনা। চারদিক থেকে আতর এবং পুষ্পের সৌরভ তাকে স্পর্শ করে। তৎক্ষণাৎ নতজানু হয়ে তিনি বললেন, প্রভু আমাকে দাগু শাহের একজন যোগ্য শিষ্য করে দাও।

আমার দোতারায় এমন সুর দাও যে, সুরের প্রতিধ্বনি সর্বশক্তি প্রাণে স্বতিগানে উর্দ্ধ লোকে ধাবিত হয়। এই সংকল্প হৃদয় নিয়ে তিনি ফিরে এলেন এবং তারা চান্দ সরকারের কাছে প্রশিক্ষণ নিতে গেলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি তারা চান্দ যোগ্য শিষ্য হতে পেরেছিলেন। কানাই লাল শীলের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠায় গুরু এত খুশি হয়েছিলেন যে, দোতারা বাদক হিসেবে তার সমস্ত জ্ঞান ও সাধনার ডালি তিনি শিষ্যকে উজাড় করে দিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তরুণ কানাই লাল শীল কৃষ্ণ লীলা নামে একটি দলে যোগ দিয়ে ফরিদপুরে যান।
সেখানে রাধিকা মোহন সাহার বাড়িতে কবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। জসীমউদ্দীন বললো সবাই তোমার দোতারা বাদ্যের প্রশংসা করছে। তাহলে আমাকে একদিন শুনাও। কানাই বললো আজ রাতে আমাদের যাত্রা গান শেষ হবে। কাল সন্ধ্যার পর আপনাকে বাজনা ও গান শোনাবো। সেই অনুযায়ী তারপরের দিন রাত আটটার সময় উপেনদা্র বারান্দায় গানের আসর বসলো। কানাইয়ের হাতে দোতারা আনন্দের হাতে খমক আর হরির হাতে জুড়ি।
প্রথমে সবাই মিলে মিউজিক বাজাইয়া গান আরম্ভ করে। সব গানই কানাইলাল শীল আগে ধরে। হরি, আনন্দ আর একজন দোয়ারি করে। গানের উপর গান করতে থাকে।। মাঝে মাঝে গান থামাইয়া আবার দোতারার বাজনা। প্রাণহীন কাঠের দোতারা যেন কানাই শীলের হাতে জীবন পাইয়া সহস্র সুরে কথা বলছে। সেই দোতারা বাজনা শুনে স্থির থাকিবার ক্ষমতা বুঝি আকাশ-ধরণী কাহার ও নাই।
কানাই লাল শীলের ডান হাতে টোকা দিয়া বাম হাতে দোতারা তারটি একটু ঘষিয়া দিয়া যে অপূর্ব সুর বাহির করে, তাহার তুলনা কোথাও নাই। কানাই গান করছে বিচ্ছেদ গান। সেই অনন্তকালের রাধা কৃষ্ণের জন্য ঝুরিয়া ঝুরিয়া যে কাঁদিয়া ছিল সে কান্না দেখার মতো না। সুরের পাখা বিস্তার করিয়া কানাই তার শ্রোতাদের এক দেশ হতে কোন দেশে লইয়া যাবে। এরকম হয়েছিল পরিবেশ।
পল্লী কবি বলিলে, সেই অনন্তকাল হইতে ত মানুষের মনের কান্না, যাকে ভালো লাগে তাকে পাই না।
গান শুনিতে শুনিতে কোন সাত সাগরের কান্নায় বুক ভাসিয়ে যায়। কোথা দিয়া যে রাত ভোর হইয়া গেল টের পাইলাম না। ফরিদপুর হতে পনেরো মাইল দূরে কড়িয়াল গ্রামের অধিবাসী ছিলেন কানাই লাল শীল। পল্লীকবি জসিম উদ্দিন কানাই লাল শীল কে কলিকাতা গ্রামো ফোন কোম্পানির প্রতিনিধি বন্ধুর হেমচন্দ্র সঙ্গে পরিচয় এবং তার গানের দলের বিষয়ে আলাপ করে দিলো।
এছাড়া মেগা ফোন কোম্পানির কোম্পানির মিস্টার জি এন ঘোষের সাথে কানাইলাল শীল ও তার দলের সাথে পরিচয় হলো। সেখানে কয়েকটি রেকর্ডের গান ইহারা বাজানোর সুযোগ পেলো। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বললো,আব্বাস উদ্দিনের রেকর্ডে দোতারা বাজিয়ে ইতিমধ্যে কানাই তাহার সঙ্গে পরিচয় হলো।

কানাই লাল শীলের কাছ থেকে শোনা, প্রাণ সখিরে ওই শোন কদমতলায় বংশী বাজায় কে। অনেক গ্রাম্য গান পল্লী কবি জসীমউদ্দীন প্রথম পদটি লইয়া পরবর্তী পদ গুলি নিজে রচনা করিয়া বিভিন্ন কোম্পানিতে রেকর্ড করেছিল। এই গানগুলোতে কানাই শীল দোতারা বাজিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে কানাই শীলের নিজস্ব লেখা ও সুর করা গান রেকর্ডে নিজের কন্ঠে বাদ দিয়ে গ্রামোফোন কোম্পানি গুলোতে দোতারা বাজাইয়া আরেক অধ্যায়ের সূচনা শুরু করলো। এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ঢাকা বেতারে মহাপরিচালক মিস্টার বোখারি মাধ্যমে ঢাকা রেডিওতে কানাই লাল শীল চাকুরিতে যোগদান করেন।
এছাড়া পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের পাঠক আমার পরিচালিত “জলে ঢেউ দিও না” “ বাদল বাঁশী” প্রভৃতি গানের রেকর্ডিং কানাইলাল শীল অপূর্ব দোতারা বাজিয়েছিলো।
এছাড়া কলকাতা মেগাফোন বিখ্যাত সংগীত শিল্পী “কমলা ঝারিয়ার” রেকর্ডিং এর সময়,কানাই লাল শীল দোতারা সঙ্গত করেন। মাস্টার্স ভয়েজে সময় কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কানাই লাল শীলের সাথে সাক্ষাৎ হয়। কানাই শীলের দোতারা মূর্ছনা নজরুল ইসলামের এত বেশি মোহিত করেছিলো যে, তিনি তাকে নিজের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে কানাই শীল পাঁচ বছর ছিলেন। তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও তে যোগদান করেন।
ঢাকায় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীতে ১৯৬৮ সালে প্রথম উদ্বোধনের সময় দোতারা বাজিয়েছিলেন। এছাড়া বর্তমানের ট্রান্সক্রিপশন যা কাকরাইলে অবস্থিত,সেখানে ও চাকুরী তে ছিলেন বেশ কিছুদিন। কানাইলাল শীল তখনকার সময় বিভিন্ন শিল্পীদের সাথে দোতারা বাজিয়েছেন। তাদের মধ্যে আব্বাস উদ্দিন, শচীন দেব বর্মন, আব্দুল আলিম, কুমুদিনী সাহা, ফেরদৌসী রহমান, আব্দুল হালিম চৌধুরী,ফরিদা ইয়াসমিন, মোস্তফা জামান আব্বাসী, নীনা হামিদ, কানন বালা সরকার সহ অসংখ্য গানে বিভিন্ন শিল্পীদের সাথে দোতারা বাজিয়েছেন।
কানাইলাল শীল নিজের লেখা ও সুর করা অসংখ্য খান রচয়িতা করে গিয়েছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার এখনো নিয়মিত গান গুলো প্রচার করে থাকে। তাকে মুকুটহীন সম্রাট বলা হয়। কারন দোতারার রুপকার ও ছিলেন। তখনকার সময়ে দোতারা মাত্র ২টি তার ব্যবহার হতো। কানাই শীল সেই ২টি তারের পরিবর্তিতে ৪টি তারে সম্মিলিত করে, দোতারাকে যেন সুরের অন্য ভুবনে নিয়ে গেলেন। যা বাংলার লোকগানে প্রাণ নিয়ে এলো এই কানাই লাল শীলের হাতের দোতারা।
দেশ ব্যাপী খাতির মালা পড়ে মাত্র ২৩ বছর বয়সে, কানাই লাল শীল ফরিদপুর জেলায়, মুন্সীচর গ্রামের জলধর শীলের দ্বিতীয় কন্যা কিশোরী বালাকে বিয়ে করেন। এই গুনী শিল্পী ৩ ছেলে ৩ মেয়ে। ১৯৭৬ইং ৫ই সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
লোক সংগীত লেখা ও সুর করা এবং বাদ্যযন্ত্র দোতারা রুপকার এর জন্য, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাংলা একাডেমী থেকে ১৯৮৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।
আরও দেখুন: