বাদ্যযন্ত্র রবাব

সঙ্গীতের বিশাল ভুবনে কিছু কিছু বাদ্যযন্ত্র আছে যেগুলো কেবল শব্দ নয়, ইতিহাসের, সংস্কৃতির এবং আত্মিক অভিব্যক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেছে। রবাব এমনই এক বাদ্যযন্ত্র, যার তারে বাঁধা রয়েছে প্রাচ্যের সুরের গাম্ভীর্য ও আবেগ। আফগানিস্তান, পারস্য ও মধ্য এশিয়ার সংগীত ঐতিহ্য থেকে উৎপত্তি লাভ করে রবাব ধীরে ধীরে ভারতীয় উপমহাদেশের লোকসঙ্গীত, সুফি ধারা ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে।

রবাবের গভীর, মৃদু অথচ ভারসাম্যপূর্ণ স্বর শ্রোতার মনে জাগিয়ে তোলে এক ধরণের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি। এটি কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়—এটি সংস্কৃতির বাহক, ইতিহাসের ধারক এবং সঙ্গীতজ্ঞদের আত্মিক সংলাপের মাধ্যম।

বাদ্যযন্ত্র রবাব

পারস্য রবাব

রবাব যন্ত্রের সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় হেনরি জর্জ ফার্মার রচিত Studies in Oriental Musical Instruments” গ্রন্থে যেখানে রবাবকে ছড়ের সাহায্যে বাজানোর যন্ত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই যন্ত্রটিই ভারতের বাইরে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে কোথাও কৰাব, কোথাও রেনার অথবা রবব নামে পরিচিত ছিলো।

আরব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই যন্ত্রটি বাজানো হতো ছড়ের সাহায্যে। প্রাচীনকালে ভারতবর্ষের বাইরে যে রবাব প্রচলিত ছিলো তা ছড়ের সাহায্যে বাজানো হতো। ভারতবর্ষে যে ধরণের রবাবের প্রচলন ছিলো সেটি ছড় দিয়ে বাজানো হতো না, আঙুলের সাহায্যে টোকা দিয়ে বাজানো হতো। এতে কোন পর্দা ছিলো না ।

মুগল রাজদরবারের প্রথম দিককার চিত্রকর্মে প্রায়শ রবার যন্ত্রটির চিত্র পাওয়া যায়। এসব চিত্রে রবাবের একটি নির্দিষ্ট আকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। চিত্র থেকে বোঝা যায় এই যন্ত্রের দেহ থেকে একটি কলার একে গলার মত অংশের সাথে যুক্ত করেছে।

কলার থেকে শুরু করে গলার দিকের অংশটা ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে গিয়েছে। এই বাঁকানো কলারের মত অংশটি প্রথম দিককার চিত্রে ততটা স্পষ্ট নয়, পরবর্তীকালের চিত্রে তা যতটা স্পষ্ট। গলার যে অংশে খুঁটি বা বয়লা থাকে সেটি লম্বা এবং শেষ প্রান্তে গিয়ে তা কোণাকুনিভাবে বেঁকে গেছে। চামড়ার ছাউনি দেওয়া দেহ কিছুটা গোলাকৃতির। এই ধরণের রবাবকে পারস্য রবাব বলে অভিহিত করা হয়।

 

পারস্য রবার

চিত্র – পারসা রবাব

 

 

ধরুপদ রবাব

 

 

ধরুপদ রবাব

অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে উপমহাদেশীয় সংগীতের জগতে রবার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বাদ্যযন্ত্র হিসেবে পরিগণিত ছিলো। মুগল আমলের শেষ দিকের চিত্রকর্মে এবং প্রাদেশিক এবং পাহাড়ী চিত্রকর্মে রবাবের যে চিত্র পাওয়া যায় তা থেকে বোঝা যায় এর দেহ বেশ বড় আকৃতির, গোলাকার এবং চামড়ার ছাউনি দেওয়া। দেহ এবং গলার মত অংশের মাঝখানে বিশেষ ধরণের কলারের উপস্থিতি আছে।

রবাব

কলারটি বাঁকানো। গলার শেষ অংশটি ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে খুঁটি আটকানোর জায়গা বা পেগ বক্সে পরিণত হয়েছে এবং এ অংশটি খুব সুন্দর নকশা করা। শেষ অংশটি গোলাকার অথবা চাকার মত ঘোরানো। এটি সরু গলার পেছন দিকে চলে গেছে। এই ধরণের রবাবকে ভারতীয় বা ধ্রুপদ রবাব বলে অভিহিত করা হয়।

 

ধরুপদ রবাব

চিত্র – ধ্রুপদ রবাব

ইতিহাসে এই ধ্রুপদ রবাবের সাথে প্রখ্যাত সংগীত গুণী সম্রাট আকবরের সভা সংগীতজ্ঞ মিঞা তানসেনের নাম জড়িত। মিঞা তানসেনের বংশে এই রবাবের বিশেষ অবস্থানের কারণে এই রবাব সেনিয়া রবাব নামেও পরিচিত। সপ্তদশ শতাব্দীর অনেক চিত্রকর্মে মিঞা তানসেন এবং অন্যান্যদের হাতে সেনিয়া রবাবের বহু ছবি দেখা যায়।

অবশ্য মিঞা তানসেন এবং তাঁর বংশধরধের হতে প্রাচীন রবার অনেকখানি পরিশীলিত রূপ লাভ করেছিলো। তানসেনের পুত্র বিলাস খানের বংশধরেরা ‘রবাবিয়া’ হিসেবে বংশ পরম্পরায় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। পারসা প্রভাবিত রবাব যন্ত্র এদেশে প্রচলিত হওয়ার পর এদেশীয় ধ্রুপদী সংগীত পরিবেশনের উপযোগী করার তাগিদে এর আকার অবয়ব ইত্যাদিতে পরিবর্তন আসতে থাকে।

ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নানারূপ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই রবাবের জনপ্রিয়তা অব্যাহত থাকে। ইতিহাসখ্যাত বিভিন্ন সংগীতজ্ঞ এবং লেখকদের রচনায় বিভিন্ন যুগে রবার যন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে হজরত আমীর খসরু তাঁর রচনায় এই যন্ত্রের উল্লেখ করেছেন। তাঁর গ্রন্থে একাধিকবার রবাবের কথা বলা হয়েছে। তৎকালীন রবাবে দু’টি তার থাকতো বলে তিনি উল্লেখ করেছেন, একটির নাম ‘বাম’ অন্যটির নাম ‘জির’।

 

রবাব

 

ষোড়শ শতাব্দীর ঐতিহাসিক আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’তে রবাব যন্ত্রের উল্লেখ আছে এবং বলা হয়েছে এতে বারো থেকে আঠারোটি তার থাকে। ৬৭ সপ্তদশ শতাব্দীতে ফকিরুল্লাহ তাঁর রাগ-দর্পণ’ গ্রন্থে রাবব নামক যন্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “রবাবের ছয়টি তাঁতের তার থাকে, তবে কেউ কেউ সাত থেকে বারোটি তার ব্যবহার করে। যে সকল যন্ত্রে বেশি তার থাকে সেগুলোতে তামার তার ব্যবহার করা হয়।

এর দু’টি প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, বর্ষাকালের আর্দ্র বাতাসে তাঁতের তার ঢিলা হয়ে যায় এবং ফলে সুরে বৈকল্য ঘটে। এ অসুবিধা দূর করার জন্য তামার তারের প্রয়োজনীয়তা আছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, এর ব্যবহারে চুটকলা এবং খেয়ালের সঙ্গে সংগত যথাযথভাবে হতে পারে এবং বাদ্যের কোমলতা বজায় থাকে। ”একইভাবে ‘সরমাইয়া-ই-ইসরাত’ গ্রন্থে রবাবে ধাতব তার ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বৈশিষ্ট্যটি সুরশৃঙ্গার যজ্ঞের অনুরূপ। ধারণা করা যায় এক পর্যায়ে এসে সুরশৃঙ্গার যন্ত্রটি রবাবকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। এখানে বলা হয়েছে প্রথম এবং পঞ্চম তারটি স্টিলের এবং দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ এবং ষষ্ঠ তারটি পিতল অথবা ব্রোঞ্জের তৈরি। মিঞা তানসেনের আমলের পরবর্তী আরো দু’শো বছর রবাব যন্ত্র আধিপত্যের সাথে প্রচলিত ছিলো। মিঞা তানসেনের কন্যাবংশীয়রা বীণ বাজাতের এবং পুত্রবংশীয়রা রবার বাজাতেন।

 

রবাব

 

এই দুই যন্ত্র একত্রে সুরশৃঙ্গার, সেতার এবং সরোদ যন্ত্রের বাদন কৌশলকে প্রভাবিত করেছিলো। ঊনবিংশ শতাব্দীতে রবারের প্রচলন ধীরে ধীরে কমে আসে। শেষ পর্যন্ত যাঁরা রবাবের চর্চা করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হচ্ছেন গয়ার বাসত খানের পুত্র মুহম্মদ আলী খান। অপর একজন হচ্ছেন ওয়াজির তার শিষ্য সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান।

 

আফগানী অথবা কাবুলী রবাব

 

 

 

আফগানী অথবা কাবুলী রবাব

 

আফগানিস্তান থেকে একেবারে ভিন্ন ধরণের রবাব অষ্টাদশ শতাব্দীতে উত্তর ভারতে আবির্ভূত হয় এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে। ভারতীয় রাজদরবারের কোন চিত্রকর্মে এই রবাবের ছবি পাওয়া যায় না। লোক পরম্পরায় প্রচলিত বর্ণনা থেকে এই যন্ত্র সম্পর্কে জানা যায়। প্রথম দিকে এই যন্ত্র নগর অঞ্চলের বাইরে লোকজ বাদ্যযন্ত্র হিসেবে প্রচলিত ছিলো, পরে হিন্দুস্তানী উচ্চাঙ্গ সংগীতের মূলধারায় যুক্ত হয় সরোদ হিসেবে রূপান্তরের মাধ্যমে।

 

আফগান রবাব

 

আফগানিস্তানে এখনো এই রবাব, যা আফগানী রবার বা কাবুলী রবাব নামে পরিচিত, তা একটি আঞ্চলিক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে লোকপ্রিয়তার সাথে টিকে আছে। পাকিস্তানের কিছু অংশে এবং কাশ্মিরেও এই যন্ত্রটি দেখা যায়। আফগানী রবার হচ্ছে ছোট গলাবিশিষ্ট লিউট। এর দেহ সরু এবং কোমর গভীরভাবে কাটা। সমস্ত যন্ত্রটি একখণ্ড কাঠ কেটে তৈরি করা হয়েছে।

কোমর থেকে গলার দিকে ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে গিয়েছে। আফগানী রবাবের ফিংগারবোর্ড কাঠের তৈরি, এর উপরের প্রান্তে দুই থেকে চারটি অস্ত্রী তারের তৈরি পর্দা বাঁধা থাকে। আফগানী রবাবের উৎপত্তিস্থল প্রকৃতপক্ষে কোথায় স্পষ্টভাবে জানা যায় না। তবে লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, গজনীতে এর উৎপত্তি এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে কাবুলে অবস্থিত তৈমুর শাহের দরবারে এর বিকাশ সাধন ঘটে।

খুব দ্রুত এটি উত্তর ভারতে স্থানান্তরিত হয়। মুগল চিত্রকর্মে আফগানী রবাবের ছবি। পাওয়া না গেলেও এই রবাবের যে বর্ণনা পাওয়া গেছে তার সাথে সপ্তদশ শতাব্দীতে অঙ্কিত মুগল চিত্রকর্মে একজন লোকশিল্পীর হাতে বাদনরত একটি যন্ত্রের খুব মিল পাওয়া যায়।

 

আফগানী অথবা কাবুলী রবাব

চিত্র – লোকশিল্পীর হাতে প্রাচীন আমলের কাবুলী রবাব

১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়ার্ড আফগানী রবাবের নিম্নরূপ বর্ণনা দিয়েছেন – “এই যন্ত্র অস্ত্রী তার দিয়ে বাজানো হয় শিং দিয়ে তৈরি একটি প্লেট্রাম ডান হাতের তর্জনী এবং বৃদ্ধাঙ্গুলিতে চেপে ধরে তা দিয়ে বাজানো হয়, বাঁ হাতের আঙুলের সাহায্যে ফিংগারবোর্ডের উপরে তার চেপে ধরে বাজানো হয়।”

প্রায় একই ধরণের রবার আফগানিস্তানে বর্তমান যুগেও প্রচলিত রয়েছে।

 

আফগানী অথবা কাবুলী রবাব

চিত্র – আফগানিস্তানে প্রচলিত আধুনিক রবাব

 

রবাব

 

রবাব

 

রবাব

 

রবাব

 

হিন্দুস্থানী রবাব

 

রবাব

 

রবাব

 

Leave a Comment