দক্ষিণ ভারতের কিছু প্রাচীন মন্দিরের গাত্রে অঙ্কিত রিলিফ চিত্রকর্মে লম্বা গলার লিউট জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। এসব নিদর্শন থেকে ধারণা করা যায়, প্রাক-মুসলিম যুগ থেকেই ভারতে সেতার বা সেভার জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন ছিল। বিশেষত, চালুক্য রাজবংশের আমলে (দশম শতাব্দী) পট্টদকল এবং দ্বাদশ শতাব্দীতে চিদাম্বরম মন্দিরে এ ধরনের চিত্র পাওয়া যায়।
যদিও আকার ও নকশায় কিছু ভিন্নতা ছিল, তবু একটি মৌলিক ধরণ সে সময়ে প্রচলিত ছিল বলে অনুমান করা যায়। সংগীতের ইতিহাসে এই বাদ্যযন্ত্রগুলোর স্থান নিয়ে ব্যাপক গবেষণার সুযোগ রয়েছে, এবং ভবিষ্যতের গবেষণায় অনেক অজানা তথ্য উন্মোচিত হতে পারে। তবুও বাস্তবে এই যন্ত্রগুলো নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি, ফলে ইতিহাসে এদের নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করা কঠিন।

নাম ও প্রমাণের অভাব
উপমহাদেশের কোথাও এই লম্বা গলার লিউটের নির্দিষ্ট নাম সম্পর্কিত স্পষ্ট প্রমাণ মেলে না। দণ্ডাকৃতি জিথারের তুলনায় এই বাদ্যযন্ত্রের সংখ্যা ছিল অল্প, এবং দণ্ডাকৃতি জিথারের প্রবল জনপ্রিয়তার কারণে এগুলো আড়ালে পড়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত উপমহাদেশে হার্প জাতীয় বীণার প্রচলন ছিল। ষষ্ঠ শতাব্দীর পর হার্পের পরিবর্তে দণ্ডাকৃতি জিথার ধীরে ধীরে প্রধান স্থান দখল করে।

মন্দিরচিত্র ও সাহিত্যিক উল্লেখ
মধ্যযুগীয় মন্দিরচিত্রে লম্বা গলার লিউট জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের উপস্থিতি নিশ্চিতভাবে ধরা পড়ে। তবে সংস্কৃত সাহিত্য এবং পরবর্তী পশ্চিমা গবেষণায় এদের উল্লেখ অত্যন্ত সীমিত। দক্ষিণ ভারতে ‘কচ্ছপী’ নামে একটি লম্বা গলার বাদ্যযন্ত্রের সম্ভাব্য উল্লেখ পাওয়া যায়, যদিও জিথার জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবের কারণে এগুলো সে সময়ে তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি।
দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সংগীতের ইতিহাসে এ ধরনের লম্বা গলার যন্ত্রের ব্যবহার ছিল খুব সীমিত এবং কয়েকটি অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে মন্দিরচিত্রে দেখা এই লম্বা গলার লিউটের সঙ্গে পরবর্তী যুগের সেতারের ধারাবাহিক সম্পর্ক প্রমাণ করা যায়নি।

প্রাচীন নিদর্শন ও চিত্রা বীণা
লম্বা গলার লিউটের চিত্র আঁকার আগেও (খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে) খাটো গলার লিউট জাতীয় কিছু বাদ্যযন্ত্রের নিদর্শন পাওয়া গেছে। অধ্যাপক লালমণি মিশ্র এবং ড. বি.সি. দেব এই বাদ্যযন্ত্রগুলোকে চিত্রা বীণা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এদের সাতটি তার ছিল এবং এগুলো মনোকর্ড গোত্রের যন্ত্রের অন্তর্গত। তবে চিত্রা বীণার সঙ্গে সেতারের সরাসরি যোগসূত্র প্রমাণ করা যায়নি।
তবুও একটি সম্ভাবনা রয়েছে যে, উপমহাদেশের অভ্যন্তরে প্রচলিত চিত্রা বীণা বাইরে গিয়ে অন্যান্য দেশে গৃহীত হয়েছিল। “চিত্রা” নাম নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে এই সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে, যা সংগীত-ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

ধ্বণিতত্ত্বমূলক বিশ্লেষণ
ড. সুনিরা কাসলিওয়াল এই বিষয়ে একটি ধ্বণিতত্ত্বমূলক বিশ্লেষণ করেছেন। ১৯৮২ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি বিভাগে বিশেষ অতিথি বক্তা হিসেবে করাচি থেকে আগত অধ্যাপক মমতাজ হুসেন “Sitar Shabda Ki Dastan” নামের একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। সেই গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে ড. কাসলিওয়াল বিশ্লেষণ করে দেখান যে, গ্রিকদের সিথারা, হিব্রুদের কিপারা, উত্তর আফ্রিকার গিথারা, আলজেরিয়ার কোইত্রা, মরক্কোর কিত্রা এবং জিপসিদের ক্ষেত্রা—এই সব নামের ধ্বণিগত মিল কেবলই কাকতালীয় নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্রের ইঙ্গিত দেয়।

মধ্যযুগের লম্বা লিউট জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের ঐতিহাসিক টাইমলাইন :
| সময়কাল | ঘটনা/উন্নয়ন |
| খ্রিস্টীয় ২য়–৬ষ্ঠ শতাব্দী | খাটো গলার লিউট জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের নিদর্শন; চিত্রা বীণার প্রচলন, ৭ তারবিশিষ্ট মনোকর্ড জাতীয় যন্ত্র |
| খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দী | হার্প জাতীয় বীণার পরিবর্তে দণ্ডাকৃতি জিথারের প্রাধান্য |
| দশম শতাব্দী | চালুক্য রাজবংশের আমলে পট্টদকল মন্দিরে লম্বা গলার লিউটের চিত্র |
| দ্বাদশ শতাব্দী | চিদাম্বরম মন্দিরে লম্বা গলার লিউটের চিত্র |
| খ্রিস্টীয় মধ্যযুগ | দক্ষিণ ভারতে ‘কচ্ছপী’ নামের সম্ভাব্য লম্বা গলার বাদ্যযন্ত্র; সীমিত প্রচলন |
| আধুনিক যুগে ভাষাগত পরিবর্তন | “চিত্রা” শব্দ থেকে Cithara → Sitara → Gatara/Gitar → Zither/Cither নামের বিবর্তন |
আন্তর্জাতিক নামভেদ ও উচ্চারণের পরিবর্তন
ড. সুনিরা কাসলিওয়ালের বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্যান্য দেশে “চিত্রা” শব্দটির উচ্চারণ সহজ ছিল না, তাই বিভিন্ন ভাষায় এর রূপান্তর ঘটেছে।
ল্যাটিন ভাষায় Cithara লেখা হলেও এর উচ্চারণ হয় Sitara (সিতারা)। এটি মূলত রোমানদের বাদ্যযন্ত্র Kithara, কিন্তু রোমান বর্ণমালায় K এর পরিবর্তে C লেখা হয়। সেই সূত্রে Kithara হয়েছে Cithara।
পরবর্তী সময়ে, পশ্চিমের কিছু ভাষায় C এর পরিবর্তে G লেখা হতে শুরু করে। ফলে রোমান Kithara বা ল্যাটিন Cithara রূপান্তরিত হয়ে দাঁড়ায় Gatara বা Gitar (গিটার)।
অস্ট্রিয়া এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে এই যন্ত্রের নাম হয়েছে Zither বা Cither, যা মূল শব্দের আরেকটি ভাষাগত বিবর্তন। এভাবে দেখা যায়, প্রাচীন উপমহাদেশীয় বাদ্যযন্ত্রের নাম ও কাঠামো ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে আজকের পরিচিত গিটার, জিথার ইত্যাদি নাম ও আকারে পৌঁছেছে।