বাংলা গীতিনাট্য-নৃত্যানাট্য এবং রবীন্দ্র নাটকের গান সূচি

বাংলা গীতিনাট্য-নৃত্যানাট্য এবং রবীন্দ্র নাটকের গান সূচি। রবীন্দ্র-নাটকের সাথে গানের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। ঘোষ বলেছেন, “কখনো কখনো রবীন্দ্রনাথ জীবনের নির্যাস হিসেবেই গানকে বুঝে নিতে চেয়েছেন, আর তখন গান তাঁর নাটকের বিন্যাস মাত্র নয়, নাটকের বিষয়ও বটে।” তবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাটকের সব গানই কিন্তু সেই বিশেষ নাটকের জন্য লেখেননি। আবার অনেক সময় ভিন্ন উপলক্ষে রচিত গানও নাটকে স্থান পেয়েছে।

বাংলা গীতিনাট্য-নৃত্যানাট্য এবং রবীন্দ্র নাটকের গান সূচি

 

প্রথম

দ্বিতীয়

তৃতীয়

চতুর্থ

পঞ্চম

 

 

ষষ্ঠ

সপ্তম

অষ্টম

নবম

দশম

 

 

একাদশ

 

“বাংলা গীতিনাট্য-নৃত্যনাট্য ও রবীন্দ্রনাটকের গান’ শীর্ষক সামগ্রিক আলোচনায় যে বিষয়টি বিষেশভাবে উপলব্ধিতে আসে তা হল রবীন্দ্রনাথের শিল্প, সাহিত্য ও সঙ্গীত অন্তকরণ কে রিগ্ধ করে। মনকে নিয়ে যায় অসীমের দিকে, মনুষ্যত্বের দিকে। চিনিয়ে দেয় নিজেকে, মানুষকে সমাজকে, দেশকে আর বিশ্বকে। শিল্পগুরু অবনীনন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মানুষকে রবীন্দ্রনাথ যা দিয়ে গেছেন তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ তাঁর গান।

মানুষকে বেীন্দ্রনাথের দান এত বিচিত্র ব্যাপক প্রচুর অমূল্য যে, তার মধ্যে কোন দান শ্রেষ্ঠ তা বলা বড় কঠিন। কিন্তু একথা বোধ হয় নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তাঁর গানের চেয়ে আর কোনো দান বড় নয়।’ রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন, ‘এই পার্থিব জীবন ও পৃথিবীর মানুষকে আমি ভালোবেসেছি। এই ভালোবাসা রেখে গেলাম আমার গানের সুরে গেঁথে। মানুষ যদি আমায় মনে রাখে তাবে এই গান দিয়েই রাখবে।

‘ রবীন্দ্রগবেষক ড.সুধাংশুশেখর শাসমল লিখেছেন, রবীন্দ্রসাহিত্য বাকরূপের দিব্যশক্তিতে উদ্দীপিত । রবীন্দ্রসঙ্গীত শব্দের মায়াপুরী। রবীন্দ্রসঙ্গীতে সৃষ্টির ধ্বনির মন্ত্র প্রতিধ্বনিত। কথা ও সুরে সমন্বিত রবীন্দ্রসংগীত কল্পান্তকালবাহী মানব চেতনাকে জাগ্রত করে। সে জাগৃতি শিল্পীজীবনে বয়ে আনে পরিপূর্ণতা বা চরম স্বার্থকতা। পরমসত্যকে প্রকাশ করতে সাহিত্য না পারলেও সঙ্গীতই পারে। তার গানই সর্বশ্রেষ্ঠ ললিতকলা।

রবীন্দ্রনাথ চিত্র ও সঙ্গীত এই দুটো উপাদানের মাধ্যমে মূর্ত ও বিমূর্তকে ছবি ও সুরের আকারে আনার স্বার্থক উপায় বলে মনে করেছিলেন। সঙ্গীতের গুরুত্ব সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বহু কথা বলে গিয়েছেন। বলেছেন, মানুষের যে আনন্দ ও আত্মপ্রকাশ মৃত্যুকে অতিক্রম করে, সঙ্গীত তার শ্রেষ্ঠ বাহন। সুর ও ছন্দের সম্মিলিত রূপই সঙ্গীত। স্বর-সমাহারের মনীষীরা সঙ্গীতকে ধ্বনির শিল্প মনে করে বলেছেন “The beautiful in music consists of sounds artistically combined.’

রবীন্দ্রগানে যেমন বিভিন্ন ধারার গান এসে মিশেছে, রবীন্দ্রনৃত্যেও তেমনি বিচ্ছিন্ন নৃত্যের সমাবেশ ঘটেছে বটে কিন্তু কোন নৃত্যধারাতেই বাঁধাধরা নিয়ম মানা হয়নি। তাই শান্তি নিকেতনে রবীন্দ্রনাথ যে নৃত্যধারার প্রচলন করেন তা আধুনিক নৃত্যেরই একটি নতুন দিগন্ত ।

বিভিন্ন ধ্রুপদী নৃত্যধারার কিছু গ্রহণ কিছু বর্জনের মাধ্যমে তা তৈরী হয়েছিল আর নেপথ্যে ছিল শান্তিনিকেতনের আশ্রম জীবনের সহজ সরল নির্মল আনন্দের আবেগ এবং মানুষের প্রকাশ ধর্মিতার কিছু স্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি এবং লীলায়িত নন্দময়তা।

জীবনপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কবি তাঁর যে সত্য উপলব্ধি সাধারণ্যে জানিয়ে গিয়েছিলেন, তা নিছক উপলব্ধি মাত্র নয়, তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকর্মের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। কবির শিল্পীমানসে এই বিচিত্র জগৎ তার রূপরস সৌন্দর্যময়তা, আনন্দ বেদনা, দুখদৈন্য, রসরহস্য এবং বাস্তবতা নিয়েই বার বার ধরা দিয়েছে। কবি এই গতিশীল ভাগতের বৈচিত্র্য বিচিত্রের দূতরূপে সঞ্চয় করে বিচিত্র রূপকগুলোকে নানা রঙ্গে-রসে সাজিয়ে তাঁর সৃষ্টিশীল তৎপরতাকে রূপায়িত করেছেন।

তাঁর প্রথম গীতিনাট্য ‘বাল্মিকী-প্রতিভা’ থেকে শুরু করে রূপক সাংকেতিক নাট্যের ধারণাবর্তনে নৃত্যনাট্য ‘শ্যামা’ পর্যন্ত পর্যালোচনা করলে এ সত্যই ধরা পড়ে যে, রূপরস ও ছন্দের বৈচিত্র রবীন্দ্রনাট্যে অভিনব বৈশিষ্ট্যে অভিব্যক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য এবং রূপক সাংকেতিক নাট্যসহ সব ধরনের নাটকগুলোর বিশেষ লক্ষণীয় দিক গান।

জীবনের প্রথম লগ্নে রয়েছে গীতিনাট্যের পর্ব, শেষ পর্বে তার নৃত্যনাট্যের। মাঝে রয়েছে তার প্রতিভা বিকাশের বিচিত্র আয়োজন ও অভিজ্ঞতার পর্ব। শিল্প সৃষ্টির বিচারে এ সমাবেশের মধ্যে এমন এক অন্তর্নিহিত সঙ্গতি লক্ষ্য করা যায় যা, রবীন্দ্রপ্রতিভার সামগ্রিক মূল্যায়ণে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সংগঠন। গীতিনাট্যগুলো তার প্রথম প্রয়াস হওয়ায় কবির ছন্দচেতনা অবিভাজ্য রূপ
পায়নি, সেটা পেয়েছে নৃত্যনাট্যে।

যেখানে নৃত্যের তালে তালে সবার অলক্ষ্যে আবির্ভাব ঘটে নটরাজের। উন্মুক্ত হয় মুক্তির রূপ, সৃষ্টি হয় অনির্বচনীয় মায়ালোক। রবীন্দ্রধারা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উক্তি দিয়েই এই লেখার ইতি টানা হচ্ছে। আমি পূর্বদেশের নানা স্থানে বেড়াবার গলে নৃত্যকলা দেখবার সুযোগ পেয়েছি। জাভায় বালীতে, শ্যামে, চীনে, জাপানে আমাদের দেশে কোচিন, মালাবার মণিপুরে ব্যূরোপের ফোকডান্স এবং অন্যান্য নাচের সঙ্গে আমি পরিচিত।

এ সম্বন্ধে আমার অভিজ্ঞতা আছে, বলবার অধিকার আছে। এই কথা আপনাদের বলতে দ্বিধা করবো না যে, আমাদের আশ্রমে নৃত্যকলার ভিতরে সকল ধারা মিলিয়ে, তার পেছনে যে সাধনা, যে শিল্পবোধ রয়েছে এবং সমগ্রের সৌন্দর্যবিকাশ আছে তা যে কোনখানেই দুর্লভ।

আরও দেখুন :

প্রচলিত তত যন্ত্র সরোদ

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় প্রচলিত তত যন্ত্র সরোদ। সেতারের মত সরোদ আবিস্কারের ইতিহাসও কিছুটা অস্পষ্ট। সরোদ যন্ত্রটি একদিনে তৈরি হয় নি। বারংবার পরিশীলনের মাধ্যমে সরোদ বর্তমান আকার এবং রূপ ধারণ করেছে এ বিষয়ে কারো কোন দ্বিধা নাই। তবে এর মূল উৎপত্তি কোথায় তা অনুসন্ধান করা দরকার। রবাব, সুর শৃঙ্গার, চিত্রা বীণা ইত্যাদি যন্ত্র সরোদের পূর্বসূরী হতে পারে, তথা প্রমাণের ভিত্তিতে একথা বলা যায়।

প্রচলিত তত যন্ত্র সরোদ

বিশেষ করে রবাবের সাথে সরোদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সবচেয়ে আলোচিত। তবে কোন সিদ্ধান্তে আসার আগে এই যন্ত্র নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো আলোচনা করা দরকার এবং বিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করা দরকার। অনেকেই সরোদকে প্রাচীন সরোদীয় বীণার সাথে সম্পর্কযুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। নামের মিল সম্ভবত এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তবে একটা বিষয় লক্ষণীয় সারদীয় বীণা নামক যন্ত্রটির উল্লেখ পাওয়া গেছে শুধু সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যে। সংগীত তত্ত্ব বিষয়ক যে সব বই লেখা হয়েছে সংস্কৃত ভাষায় সেগুলোতে সারদীয় বীণার উল্লেখ পাওয়া যায় নি। এর কোন বৈশিষ্ট্য কিংবা বর্ণনা কিছুই কোথাও পাওয়া যায় প্রকৃতপক্ষে ধ্বণিগত সাদৃশ্য ছাড়া সরোদের সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই।

 

 

অনেকে রুদ্রবীণার সাথে সরোদের আবির্ভাবকে সম্পর্কযুক্ত করতে চেষ্টা করেছেন। সম্ভবত এখানেও রুদ্র বীণার অন্তর্গত ‘রুদ’ শব্দটি এই ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। এর পেছনে আরেকটি বিভ্রান্তিকর কারণ থাকতে পারে, তা হলো অনেকে রুদ্র বীণা এবং রবাবকে অভিন্ন বলে ভাবার চেষ্টা করেছেন। রুদ্রবীণা উপমহাদেশে প্রচলিত একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সুপরিচিত বীণা যা অনেক ক্ষেত্রে শুধু বীণ নামেই পরিচিত।

বাঁশের তৈরি দণ্ড হচ্ছে এই যন্ত্রের মূল কাঠামো এবং তার নিচে দু’টি লাউ সংযুক্ত থাকে। দৃশ্যত বোঝা যায় এ যন্ত্রটি একটি দণ্ডাকৃতি জিথার। পক্ষান্তরে রবাব একটি লিউট জাতীয় যন্ত্র। রবার যন্ত্রের সাথে রুদ্র বীণার কোন মিলও নাই । কাজেই রবাব থেকে সরোদের উৎপত্তি, এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে কেউ যদি রুদ্র বীণা থেকে সরোদের উৎপত্তি বলে মত প্রকাশ করেন তবে আকে বাস্তবসম্মত বলা যায় না। কাজেই রুদ্র বীণা থেকে সরোদ উদ্ভাবনের ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

রবারের সাথে সরোদের মিল সবচেয়ে বেশি। রবার থেকে সরোদ উদ্ভাবনের পক্ষে যুক্তিও সবচেয়ে বেশি। তবে এ প্রসঙ্গে প্রথমে আলোচনা করা দরকার রবার বলতে আসলে কোন যন্ত্রটিকে বোঝানো হয়। কারণ রবাব কিন্তু একাধিক আকৃতির ছিলো।

 

 

মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগের শুরুতে মূলধারার হিন্দুস্তানী সংগীতের জগতে অন্তত তিন বা চার ধরণের রবাবের আগমন ঘটেছিলো। সেজন্য সরোদ যন্ত্রের উদ্ভবের বিষয়টি ব্যাখ্যা করা আগে আমাদের অবশ্যই বিভিন্ন ধরণের রবাবের বৈশিষ্ট্যের প্রতি আলোকপাত করা দরকার।

আরও দেখুন :

দুই অঞ্চদের বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধন সেতার

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় দুই অঞ্চদের বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধন সেতার দুই অঞ্চলের বাদ্যযন্ত্র বলতে এখানে উপমহাদেশের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রসমূহ যা প্রাচীনকাল থেকে এদেশে প্রচলিত রয়েছে সেগুলো এবং উপমহাদেশের বাইরে থেকে আগত বাদ্যযন্ত্রসমূহকে বোঝানো হয়েছে।

দুই অঞ্চদের বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধন সেতার

সেতার যন্ত্রের আবির্ভাবের পূর্বে তম্বুর যন্ত্রটি দীর্ঘকাল এই উপমহাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলো। তম্বুর যন্ত্রের পারসা প্রভাবিত রূপটি ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত অক্ষুন্ন থাকে। এরপর ধীরে ধীরে এতে কিছু পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে। উপমহাদেশে পূর্ব থেকে প্রচলিত বাদ্যযন্ত্রসমূহের প্রভাবে এই পরিবর্তনগুলো ঘটতে থাকে। মূলত বীণের (রুদ্র বীণা ‘বীণ’ নামে সর্বসাধারণের কাছে পরিচিত ছিলো)

বৈশিষ্ট্যগুলো সেতারে যুক্ত হতে থাকে এবং এভাবেই ভারতীয় এবং পারস্য প্রভাব মিলে মিশে একটি নতুন যন্ত্রের রূপায়নকে ত্বরান্বিত করে। পারস্য প্রভাবিত যন্ত্রগুলোর মধ্যে শুধু তম্বুর কিংবা সেতার নয়, বরং পারস্য ‘উদ’ এবং উজবেক দুতারা যন্ত্রের প্রভাবের কথাও উল্লেখযোগ্য।

 

চিত্র – উজবেক দুতার

এ প্রসঙ্গে সংগীত গবেষক ড. ওয়াহিদ মির্জার মন্তব্য উদ্ধৃত করা হলো। “উপমহাদেশে পূর্ব থেকে প্রচলিত কোন বাদ্যযন্ত্রের বিবর্তনের ফল হচ্ছে সেতার, একথা প্রায় সকল গবেষকই বিশ্বাস করেন। যখন পারস্য এবং উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির মিশ্রণ শুরু হয় সম্ভবত সে সময়ে এই বিবর্তনের শুরু। সেতার যন্ত্রটি দেখতে পারস্যের তম্বুর কিংবা উদ্ নামক যন্ত্রের মত, বাদন রীতিতে আবার ভারতীয় বীণার মত। নিঃসন্দেহে এটি ভারতীয়-পারস্য মিলিত সংস্কৃতির প্রভাবে সৃষ্ট এক অনন্য সৃষ্টি।

সংগীত গবেষক ম.ন. মুস্তাফা “আমাদের সংগীত ইতিহাসের আলোকে” গ্রন্থে লিখেছেন- “সেভারের আকারে পারস্য ‘উদ’ এবং উপাদানে ‘বীণা’র সাদৃশ্য দেখা যায়। কেবল পার্থক্য এই যে, সেতারের পর্দাগুলোকে ঘুরিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বিন্যস্ত করে নেয়া যায়। সেতারের এই বিন্যস্তকরণ বা ব্যবস্থাপূর্বক সমন্বয় করার সুবিধার জন্য একে যে কোন সুর সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করা চলে।”
প্রাসঙ্গিকভাবে ‘উদ’ যন্ত্রটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।

প্রাচীন আরবদেশে প্রচলিত ‘উদ’ নামক যন্ত্রটি পারস্যে পরবর্তীকালে ‘বারবাত’ নামেও পরিচিত। উদ যন্ত্রটির দেহ আধখানা নাশপাতির মত আকারের। এটি খাটো গলাবিশিষ্ট লিউট জাতীয় যন্ত্র। প্রসঙ্গে সংগীত পেকট্রাম দিয়ে বাজাতে হয়। এর দেহ এবং ফিংগারবোর্ড কাঠের তৈরি। শব্দ প্রকোষ্ঠের উপরের অংশে একাধিক সাউন্ড হোল থাকে। প্রাচীন উদ যজ্ঞে মোট নয়টি তার থাকতো।

প্রথম চারটি জোড়ায় জোড়ায় এবং শেষেরটি একক। দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই যন্ত্রে পর্দার প্রচলন ছিলো, এর পর ধীরে ধীরে পর্দার ব্যবহার উঠে যেতে থাকে। চতুর্দশ শতাব্দীর পরে কোন উদ যন্ত্রে পর্দার ব্যবহার দেখা যায় না। উদের ফিংগারবোর্ডের শেষ প্রান্তে খুঁটি আটকানোর জায়গাটি পেছন দিকে বাঁকানো। প্রসঙ্গে সংগীত প্লেকট্রাম হিসেবে পাতলা লম্বা এক খণ্ড কাঠের টুকরা ব্যবহার করা হতো। মধ্যপ্রাচ্যে উদ বাদ্যযন্ত্রের রাজা হিসেবে পরিচিত।

 

চিত্র – উপ

পরিশেষে বলা যায় সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অহোবল রচিত ‘সংগীতপারিজাত’ গ্রন্থে যখন নিবন্ধ এবং অনিবন্ধ তম্বুরের কথা উল্লেখ করেছিলেন, তখন থেকেই এই যন্ত্রে পরিবর্তন কিংবা বিবর্তনের সূচনা। পরবর্তী একশত বছরে পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে সেতারের চূড়ান্ত রূপ পরিস্ফুট হয়ে আসে। লিখিতভাবে ‘সেতার’ যন্ত্রটির নামের উল্লেখ সর্বপ্রথম পাওয়া যায় দরগাহ কুলি খাঁ রচিত “মুরাক্কা-ই-দিল্লী’ (১৭৩৯) গ্রন্থে।

এর আগে সমগ্র ভারতবর্ষের কোন লিখিত ইতিহাস কিংবা সাহিত্যগ্রন্থ কোন কিছুতেই সেতার নামক কোন যন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায় নি। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের কিছু পরে একাধিক হিন্দী কবিতায় এই যন্ত্রের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন, কবি শাহ আলম রচিত ‘নাদিরাত-ই-শাহী এবং কবি যশরাজ রচিত ‘হাম্মীর রাসো’ ইত্যাদি।

ইউরোপিয়ানদের লেখায় সেতারের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে, এক ইউরোপিয়ান পর্যটকের লেখা ভ্রমণকাহিনীতে। প্রকৃতপক্ষে এই উপমহাদেশে সেতার যন্ত্রের আবিষ্কার ঠিক কোন সময়ে হয়েছে তা সঠিকভাবে বলা খুব দুরূহ ব্যাপার। প্রসঙ্গে সংগীত তবে প্রথম প্রামাণ্য দলির হিসেবে ‘মুরাক্কা-ই-দিল্লী’ গ্রন্থটি খুব গুরুত্ববহ। সম্রাট মুহাম্মদ শাহ রঙ্গিলের আমলে এটি লেখা হয়। বইটিতে সদারঙ্গ, অদারগ প্রমুখের বর্ণনা আছে।

প্রসিদ্ধ বীণকার নিয়ামত ধার প্রচলিত নাম ছিলো সদারঙ্গ। তাঁর ভ্রাতপুর ফিরোজ বা অদারঙ্গ নামে পরিচিত ছিলেন। ‘মুরাক্কা-ই- দিল্লী’ গ্রন্থে দিল্লীর রাজসভার প্রায় ষাটজন সংগীতজ্ঞ এবং তাদের সংগীত পরিবেশনের প্রাণবন্ত বর্ণনা পাওয়া যায়। সে সময়কার প্রধান সংগীতজ্ঞ ছিলেন নিয়ামত খান। তাঁর ভাই এবং ভ্রাতষ্পুত্রকেও বিখ্যাত বাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।বলা হয়েছে –

“ ( নিয়ামত খানের) ভাইয়ের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাবার আশ্চর্য দক্ষতা রয়েছে। এক নাগাড়ে চার ঘন্টা ধরে তিনি বিভিন্ন ধরণের সুর (ধুন) বাজাতে পারেন, কিন্তু তাঁর এমন শৈলী যে কোন সুরের পুনরাবৃত্তি ঘটে না। তাঁর এই শৈল্পিক গুণ দেখে বড় বড় সংগীতজ্ঞরা হতভম্ব।

আল্লাহ এই দক্ষতা ও পরিপক্কতা সবাইকে দেন নি। তিনি একজন দক্ষ গায়কও। নিয়ামত খানের ভ্রাতষ্পুত্র সেতার বাদনে খুব দক্ষ। তিনি অনেকগুলো নতুন কৌশল আবিস্কার করেছেন। প্রসঙ্গে সংগীত অন্যান্য পরিচিত সব যন্ত্রে যতগুলো সুর বাজানো যায়, এই লোক সেতারে তার সবগুলোই বাজাতে পারেন।”

 

 

প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এই ভাইটি হলেন খসরু খান, যিনি পরে আমীর খসরু নামে পরিচিতি লাভ করেন এবং ভ্রাতষ্পুত্রটি হচ্ছেন ফিরোজ খান। চিত্রকর্ম থেকে যদি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী সেতারের বিবর্তন সম্পর্কে আমরা ধারণা লাভ করতে আই তাহলে বিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে প্রাপ্ত চিত্রকর্মে সেতারের যে ছবি পাওয়া যায় সেগুলোকেই প্রাথমিক যুগের সেতারের নিদর্শন বরে ধরে নিতে হবে।

আকারে ছোট হলেও এর প্রায় সব কিছুই এখনকার সেতারের মত। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে পাটনায় এক শিল্পীর আঁকা একটি জলরঙের চিত্রকর্মে এবং ১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লীতে আঁকা দু’টি পোর্ট্রেটে এ ধরণের সেতারের চিত্র পাওয়া যায়। ছবিগুলো বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে রক্ষিত আছে। দিল্লীতে প্রাপ্ত অপূর্ব চিত্র দু’টিতে দেখা যায়, কর্নেল জেমস স্কিনারের দু’জন কর্মচারী সুকির খান এবং জঙ্গী খান বসে সেতার বাজাচ্ছেন।

সেতারের প্রতিটি ডিটেইল এই চিত্রে বোঝা যায়। যেমন, চেপ্টা আকৃতির পর্দা, যা সোনালী রঙে আঁকা হয়েছে, যন্ত্রে তারের অবস্থান প্রসঙ্গে সংগীত ( দণ্ডের মাঝামাঝি জায়গায় যাতে তার টেনে মীড় বাজানো সম্ভব হয়) এবং বাঁ হাতের আঙুলের সাহায্যে মীড় টানলে যে ভঙ্গি হয় সে ধরণের ভঙ্গি ইত্যাদি ।ক্রমান্বয়ে সেতার যন্ত্রের নানা বিবর্তন ঘটে।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে সুকির খানের হাতে যেমন ছোট আকারের সরু দণ্ডবিশিষ্ট সেতারের পরিচয় পাওয়া যায়, অপরদিকে কোন কোন চিত্রে চওড়া দণ্ডবিশিষ্ট সেতারের পরিচয়ও পাওয়া যায়।

বেলজিয়ান লেখক এবং শিল্পী এফ. বালথাজার্ড সলভিস-এর লেখা বই A Collection of two hundred and fifty coloured echings descriptive of the manners. customs and dress of the Hindus, যা প্রথমে কোলকাতায় প্রকাশিত হয় ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে, পরে লন্ডন এবং প্যারিস থেকেও প্রকাশিত হয়, তাতে যে সেতারের ছবি আঁকা হয়েছে তার দণ্ড চওড়া এবং যন্ত্রটি ছয় তার বিশিষ্ট।

ব্রিজ কিছুটা পাতলা হলেও উপরিভাগ সমতল, অর্থাৎ জওয়ারি বিশিষ্ট। আগের সেতারগুলোর চেয়ে এর আকার বড়। শুধু আকারের পার্থক্য নয়, মূল লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হলো, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী এখানে দণ্ডের উপরিভাগ অর্থাৎ পটরীর উপরে এক প্রান্ত থেকে আপর প্রান্ত পর্যন্ত সবটা অংশ জুড়ে তার ছড়ানো রয়েছে। এই ধরণের সেতারে বাঁ হাতের সাহায্যে তার টেনে মীড় বাজানোর সুযোগ নাই।

তবে মজার ব্যাপার এই যে, বর্তমান যুগেও অঞ্চলভেদে ভারতের কোন কোন অংশে এ ধরণের সেতারের অস্তিত্ত্ব পাওয়া যায়। যেমন, গুজরাটে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ‘দেশী সেতার’ নামে যা প্রচলিত সেটির দণ্ড এই রকম চওড়া এবং এর বাজ তার হচ্ছে একজোড়া তার, একত্রে দু’টি তার বাজানো হয়। এই তার দু’টির অবস্থান পটরীর একেবারে শেষ প্রান্তে। অর্থাৎ এই তার টেনে মীড় বাজানো সম্ভব নয়।

খরজ ইত্যাদি মিলিয়ে আরো ছয় থেকে আটটি তার এতে আছে, যেগুলো বাঁ হাতে বাজাতে হয় না, ড্রোন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আধুনিক সেতারে এতগুলো তার থাকে না এবং পটরীর মধ্যভাগেই তারগুলো শেষ হয়ে যায়। বাকী অংশ খালি রাখতে হয় বাজ তার বা মূল তার বা হাতে টেনে মীড় বাজানোর জন্য ।

 

চিত্র – ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে রক্ষিত সলভিস অঙ্কিত চওড়া দণ্ডবিশিষ্ট সেতারের ছবি।

সলভিস তাঁর দেখা সেতার সম্পর্কে ভাল মন্তব্য করেন নি। বাদকদের সম্পর্কে তিনি লিখেছেন- “এরা মাঝে মাঝে এক পর্দা থেকে অন্য পর্দায় হাত সরিয়ে সুর বাজায়, এর চেয়ে একজন ইউরোপীয় লোকের হাতে দিলে যন্ত্রটি আরো ভাল বাজাতে পারতো। ”
স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে, দিল্লীর রাজদরবারে যে ধরণের সেতারের পরিচয় পাওয়া যায় এটি সে ধরণের সেতার নয়।

চিত্র দেখেও বোঝা যায় যে এই সেতার মীড় বাজানোর উপযোগী নয়। সম্ভবত এই যন্ত্র গৎ- তোড়া বাজিয়ে একক বাদন পরিবেশনের উপযোগী ছিলো না। উন্নতমানের নিজস্ব ঘরানার স্টাইলে সংগীত পরিবেশন বলতে আমরা যা বুঝি তার পরিচয় পাওয়া যায় মসিত বার বাজে। আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে রচিত শরমাইয়া-ই-ইশরাত’ গ্রন্থে দিল্লী বাজের কথা বলা হয়েছে। মসিত বা এই স্টাইলে বীণকারদের মত বাজনা বাজাতেন মীড়, ঠোক এবং ঝালা সহকারে।

‘সংগীত সুদর্শন’ গ্রন্থে সুদর্শন শাস্ত্রী লিখেছেন, মসিত বা তাঁর পিতার কাছ থেকে সেতার বাদন শিক্ষা লাভের পর সেতার যন্ত্রকে অনেক পরিশীলিত করেছেন। পরিশীলিত করার ফলেই তাতে ধ্রুপদ অঙ্গ তথা বীণের কারুকাজ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। সুকির খাঁ এবং জঙ্গী খাঁর হাতে যে ধরণের সেতার দেখা গেছে তা সম্ভবত এই ধরণের সেতার। কারণ চিত্র দেখেই বোঝা যায় যে, এতে মীড়, গমক ইত্যাদি বাজানোর সুযোগ রয়েছে।

অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দী সেতারের ইতিহাসের জন্য খুব গঠনমূলক একটি সময়। এ সময়ে সেতার বাদকের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। অগণিত পেশাদারী এবং সৌখিন বাদকের হাতে এসে সেতারের দ্রুত বিবর্তন ঘটতে থাকে ।

১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসে একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে সেতার দেখার পর ফ্রাংকয়েস জোসেফ ফেটিস তাঁর “Histoire generale de la musique: depuis les temps les plus anciens jusqu’a nos jours” গ্রন্থে সেতারের তারের বিবরণ দিয়ে বলেছেন এর পাঁচটি মূল তার আছে যেগুলো গলা বরাবর অতিক্রান্ত হয়ে হরিণের হাড়ের তৈরি ব্রিজের উপর দিয়ে নিয়ে গিয়ে খুঁটিতে আটকানো হয়।

আরো দু’টি তার গলার বাম পাশে বেশ নিচে লাগানো দু’টি খুঁটিতে আটকানো হয়। এই দু’টি তার কিভাবে বাঁধা হয়। তা ফেটিসের ভাষায় শুনলে যথার্থ হবে। “These two harmonize in unison with the notesproduced by the progression of the fingers on the principal strings” স্পষ্টত এখানে চিকারীর তারের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসে এটিই সেতারে চিকারীর তারের সর্বপ্রথম বিবরণ।

১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে মোহাম্মদ করম ইমাম রচিত “মাদান- আল-মসিকী’ গ্রন্থে বিখ্যাত সব সেতার বাদকদের সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এ সকল বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, এ সময়ের মধ্যে সেতার অত্যন্ত উন্নতমানের যন্ত্রে পরিণত হয়েছিলো। বিশেষ করে জয়পুরের সেনিয়াদের হাতে এর প্রভূত উৎকর্ষ সাধিত হয়। এরপরও ধ্রুপদ অঙ্গের বিস্তারিত আলাপচারী, যা সাধারণত বীপে বাজানো হতো, তা তখনকার সেতারে বাজানো সম্ভব ছিলো না।

সেজন্য দেখা যায়, ‘সুরবীণ’ নামে একটি যন্ত্র এবং ‘বীণ-সিতার’ নামে অপর একটি যন্ত্র সে সময় আবির্ভূত হয় আলাপচারীর প্রয়োজন মেটাতে। ‘সুরবীণ’ ছিলো রুদ্র বীণা এবং সেতারের সমন্বয়। বীণ-সিতার’ যন্ত্রে তিনটি তুম্বা এবং তরফের তার ব্যবহৃত হতো। তবে এ যন্ত্রগুলোর কোনটি স্থায়ীত্ব লাভ করে নি।

বরং আরেকটি যন্ত্র এ সময়ে আবিষ্কৃত হয়, যার নাম ‘সুরবাহার’, এ যন্ত্রটি পরবর্তী সময়ে বেশ দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সুরবাহারে তরফের তার ছিলো, প্রাচীন সেতারে ছিলো না। এটি ছিলো সেই সময়ে সেতারের সাথে উল্লেখযোগ্য একটি পার্থক্য।

 

চিত্র – সুরবাহার

বীণ-সিতার, সুরবাহার ইত্যাদি যন্ত্র নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি সেতার যন্ত্রে পরিমার্জনা অব্যাহত থাকে। একে আলাপচারীর উপযুক্ত করে তোলার জন্য গবেষণা হতে থাকে। সুনিরা কাশলিওয়ালের রচনা থেকে জানা যায়, ঊনবিংশ শতকের শেষ অর্ধাংশের কোন সময়ে সেতারে তরফের তার সংযোজিত হয়। এ সময়ে সেতারের আকারও আগের চেয়ে বড় হয়। জয়পুরের সেতারীরা তিন তুম্বা বিশিষ্ট সেতার বাজাতেন।

তবে পরিবর্তন ও পরিশোধনের শেষ পর্যায়ে এসে একটি তুম্বা কমে গিয়ে শেষ পর্যন্ত দু’টি তুম্বা অবশিষ্ট রইলো। একটি হলো দেহের মূল অংশ এবং অপরটি হলো একটি ছোট লাউ যা দণ্ডের প্রায় শেষ প্রান্তে সংযুক্ত থাকে। এটি স্ক্রুর সাহায্যে সংযুক্ত থাকে, প্রয়োজনে খুলে ফেলা যায়। এ সমস্ত পরিবর্তন এবং পরিশোধনের একটি মূল উদ্দেশ্য ছিলো বীণ অঙ্গের প্রায় সমস্ত বৈশিষ্ট্য সেতারে বাদনের উপযোগী করে তোলা।

বর্তমানে এই উদ্দেশ্য সফল বলা চলে। এক সময়ে রেওয়াজ ছিলো এ রকম যে, শিল্পী প্রথমে সুরবাহার যন্ত্রে আলাপ বাজতেন, পরে সেতার নিয়ে বসে গং, তান ইত্যাদি বাজিয়ে পরিবেশনা শেষ করতেন। বর্তমানে আর তেমন করা হয় না। সেতার যন্ত্রটি এখন আলাপ বাজানোর জন্য খুব উপযুক্ত। একই যন্ত্রে প্রথমে আলাপ, জোড় আলাপ ইত্যাদি বাজিয়ে পরে গৎ, তান, ঝালা ইত্যাদি বাজানো হয়।

বিশেষ করে আধুনিক যুগের শিল্পীদের মধ্যে পণ্ডিত রবি শঙ্করের বাদন শৈলীর কথা উল্লেখ না করলে এতদসংক্রান্ত আলোচনা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সেরা শিষ্যদের অন্যতম পণ্ডিত রবি শঙ্কর। সেনীয়া ঘরানার মূল বৈশিষ্ট্য আলাপচারীর কাজ। বিস্তারিত আলাপচারীর কাজ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ঘরানারও মূল বৈশিষ্ট্য। আলাপচারীর সমস্ত শিক্ষা ওস্তাদ আলাউদ্দিন বা দিয়ে গেছেন। শিষ্য রবি শঙ্করকে।

রবি শঙ্কর মূল তারে বাদনের পরে খরজের তারে অর্থাৎ খাদে মীড় পরিবেশনের মাধ্যমে যেভাবে সুরবাহারের বৈশিষ্ট্যে আলাপ পরিবেশন করে থাকেন তা নিঃসন্দেহে অসাধারণ। আলাপে সুরবাহারের যে বৈশিষ্ট্য, শ্রোতারা সেটি যেমন পেয়ে থাকেন, তেমনি সেতারে বাজানো গ‍ তানের কাজও শ্রোতারা উপভোগ করে থাকেন। অর্থাৎ একটি যন্ত্রের পরিবেশনা থেকে পূর্ণতার স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন শ্রোতারা। ইতিহাসের আলোকে বলা চলে বর্তমানে প্রচলিত সেতার হচ্ছে এই যন্ত্রের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রূপ ।

আরও দেখুন :

আরব্য ও পারস্য বাদ্যযন্ত্র এবং সেতার

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় আরব্য ও পারস্য বাদ্যযন্ত্র এবং সেতার। উত্তর-পশ্চিম ভারতে মুসলমানদের আগমণের শুরুতে এবং দ্বাদশ শতাব্দীতে দিল্লীতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উত্তর ভারতের সংস্কৃতিতে প্রভূত পরিবর্তন আসে। পরবর্তী ছয়শ বছরে তুরস্ক পারস্য এবং মধ্য এশিয়ার শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম এবং অন্যান্য রীতিনীতির আগমন ঘটে মুসলিম শাসকদের রাজদরবারের শিল্পী এবং জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিদের মাধ্যমে।

আরব্য ও পারস্য বাদ্যযন্ত্র এবং সেতার

মুসলিম শাসনামলের শুরুর দিকে উত্তর ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে যে সকল বাদ্যযন্ত্রের আগমন হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘তম্বুর’ (কখনও ‘তানবুর’ নামেও পরিচিত)। এটি পর্দাযুক্ত লম্বা গলা বিশিষ্ট লিউট।

হেনরী জর্জ ফার্মার রচিত ‘দি ইভলিউশন অব দি তম্বুর ইন পান্ডোর গ্রন্থ অনুযায়ী আরব রচনাবলি থেকে পর্দাযুক্ত তমুরের বর্ণনা প্রথম পাওয়া যায় নবম এবং দশম শতাব্দীতে এবং এর উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা যায় বাগদাদের বাদ্যযন্ত্র হিসেবে পরিচিত একটি বাদ্যযন্ত্রকে যার কথা বলা হয়েছে Measured Tambur। দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে তম্বুর একটি প্রধান বাদ্যযন্ত্র হিসেবে পরিগণিত হয়।

 

 

ভারতবর্ষে ১০৭৬ খ্রিস্টাব্দে আফগানিস্তানের শাসক মুহম্মদ গজনবী কর্তৃক পাঞ্জাব অধিকৃত হওয়ার সময় ভারতীয়-পারসা কবি মাসুদ-ই সাদ-ই সালমান লাহোরের রাজসভায় আরবা এবং পারস্য বাদ্যযন্ত্রসমূহের মধ্যে তম্বুর’এর কথা উল্লেখ করেছেন। দিল্লীর প্রথম দিককার পারসা ঐতিহাসিক হাসান নিজামী ১২০০ খ্রিষ্টাব্দে এর উল্লেখ করেছেন।

আমীর খসরু ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষদিকে দিল্লীর রাজদরবারে এই “তদুর এর কিছুটা বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এ সময় থেকে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন লেখকের রচনা থেকে প্রায় একই ধরণের বর্ণনা পাওয়া গেছে।

 

চিত্র – সম্রাট আকবরের আমলে অঙ্কিত (১৫৫৬-১৬০৫) যুগল চিত্রকর্মে তম্বুরের ছবি

যুগল আমলের মিনিয়েচার শিল্পকর্মে ‘তম্বুর’ যন্ত্রটির অত্যন্ত সুন্দর কিছু চিত্র পাওয়া গেছে। চিত্র দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যন্ত্রের মূল অংশ নাশপাতি আকারের, উপরিভাগ চেষ্টা, সাথে যুক্ত একটি সরু গলার মত অংশ যা ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে গিয়েছে। গলার শেষ অংশে তার আটকানোর জন্য সাধারণত চারটি খুঁটি থাকতো, খুঁটিগুলো দণ্ডের দুই পাশে অবস্থিত। একটি ব্রিজ বা সওয়ারি থাকতো, যা পাতলা, বর্তমান সেতারের মত নয়।

পর্দাগুলো সূতা দিয়ে দণ্ডের গায়ে বাঁধা হতো। সম্পূর্ণ যন্ত্রটি কাঠের তৈরি। আমীর খসরুর বর্ণনায় পাওয়া যায় যজ্ঞে দু’টি রেশমের তার এবং দু’টি ধাতব তার ব্যবহৃত হতো। এর শব্দ ছিলো তীক্ষ্ণ। আমীর খসরুর পরবর্তী সময়ে দিল্লীর রাজদরবারে অন্যান্য যন্ত্রের মধ্যে তম্বুর বেশ প্রাধাণ্য লাভ করেছিলে।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে মুগল শাসনের অব্যবহিত পূর্বে সিকান্দার লোদীর শাসনামলের একটি রচনায় রাজদরবারে নিযুক্ত সংগীতজ্ঞদের মধ্যে একজন তম্বুর বাদক এবং একজন বীণাবাদকের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত ‘আইন-ই-আকবরী’তে ছত্রিশজন সভাবাদকের নামের যে তালিকা দেওয়া হয়েছে তাতে চারজন তম্বুর বাদকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

কোন একটি যন্ত্রে এটিই সবচেয়ে বেশি বাদকের সংখ্যা। জাহাঙ্গীরের আমলের একটি অসাধারণ মিনিয়েচার চিত্রকর্মে দেখা যায়। একজন তম্বুর বাদক গ্রাম্য এলাকায় বসে তম্বুর বাজাচ্ছেন।

 

চিত্র – সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে অঙ্কিত (১৬০৫-১৬২৭ ) যুগল চিত্রকর্মে তম্বুরের ছবি

তমুর ছিলো সুর বাজানোর যন্ত্র। সুর ধরে রাখার যন্ত্র নয়। কালক্রমে কোন এক পর্যায়ে এসে যন্ত্রটির কিছুটা রূপান্তরের মাধ্যমে এদেশীয় যন্ত্রে পরিণত করা হয় এবং শুধু মূল সুর সম্পর্কে গায়ককে সজাগ রাখার জন্য গানোর সহযোগী ড্রোন জাতীয় যন্ত্র হিসেবে এর ব্যবহার শুরু হয়।

স্বাভাবিকভাবে তখন আর পর্দা ব্যবহারের প্রয়োজন থাকলো না। পর্দাবিহীন এই যন্ত্রটির পরিচিতি হলো ‘তম্বুরা’ নামে। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে সম্রাট আকবর এবং জাহাঙ্গীরের রাজদরবারের চিত্রে এই ধরণের যন্ত্র সহযোগে গান গাওয়ার ছবি পাওয়া যায়।

সেতারের আবির্ভাবে তম্বুরের প্রভাব প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসি। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিক পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্প নিদর্শনে তম্বুরের অবিরাম উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে তখন পর্যন্ত ‘সেতার’ নামে কোন বাদ্যযন্ত্রের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায় নি। অষ্টাদশ শতাব্দীর চিত্রে প্রাপ্ত যন্ত্রগুলো স্পষ্টত তম্বুর ছিলো। কারণ সেতারের সাথে এর গঠনে কতগুলো মৌলিক পার্থক্য আছে।

এই মৌলিক পার্থক্যগুলোর কারণেই উক্ত চিত্রগুলো তম্বুরের, সেতারের নয়, এই মত গবেষক এলাইন মাইনারের। তিনি গবেষণা করে তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেেছন :

(১) তার আটকানোর খুঁটি বা বয়লার অবস্থান শুধু দণ্ডের দু’পাশে অর্থাৎ দণ্ডের সাথে আনুভূমিক (সেতারে আনুভূমিক ও লম্ব দু’ভাবে বয়লা লাগানো হয়),

(২) দণ্ড ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে গিয়েছে ( সেতারে দণ্ড সর্বদা সমান্তরাল থাকে),

(৩) পাতলা ব্রিজের উপস্থিতি (প্রকৃত জওয়ারি অনুপস্থিত)।

 

 

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েও প্রকৃত সেতারের কোন নিদর্শন পাওয়া যায় না। কিন্তু আরো পরে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে কোম্পানী শাসনামলে ইউরোপীয় শিল্পীর আঁকা চিত্রকর্মে যার নিদর্শন পাওয়া যায় তাকে প্রকৃতপক্ষে ‘সেতার’ বলে চিহ্নিত করা যায়। কারণ এর তার আটকানোর খুঁটি, দণ্ডের সমাণ্ডারল আকৃতি এবং জওয়ারি করা ব্রিজ – এ সব ক’টি – বৈশিষ্ট্যই বর্তমানকালের সেতারের অনুরূপ।

১৭৯০ সালের একটি নমুনাকে প্রাথমিক সেতারের খুব কাছাকাছি বলে ধরে নেওয়া যায়। এটি হচ্ছে মহারাজা সওয়াই প্রতাপ সিং-এর পর্দাহীন তানপুরা, যা জয়পুরের মহারাজা দ্বিতীয় সওয়াই মান সিং যাদুঘরে সযত্নে রক্ষিত আছে। জয়পুরের মহারাজা সওয়াই প্রতাপ সিং নিবন্ধ তানপুরা বলে যা পরিচিত ছিলো সেতার বলতে তাকেই বোঝানো হয় বলে মনে করতেন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে বিষয়টি বাস্তবেও তাই হয়েছিলো বলে প্রতীয়মান হয়। যাদুঘরে প্রাপ্ত নমুনাটি যদিও তানপুরা, সেতার নয়, তবু ঐতিহানিক নিদর্শন হিসেবে এর মূল্য অপরিসীম এ কারণে যে, প্রতাপ সিং তাঁর ‘সংগীত সার’ গ্রন্থে নিবন্ধ তানপুরা, অর্থাৎ সেতার এবং অনিবদ্ধ তানপুরা দেখতে একবারে এক রকম, শুধু একটি পার্থক্য ছাড়া, তা হলো পর্দার উপস্থিতি, একথা উল্লেখ করছেন।

যে যন্ত্রটির কথা বলা হলো, সেটির আকার বেশ ছোট, ১৮শ শতকের চিত্রকর্মে যেমনটি দেখা যায়, তবে চিত্রের সাথে পার্থক্য হলো, নয়না দপ্তর সাথে আনুভূমিক এবং লম্ব দুই আবস্থানেই আছে, দণ্ডটিও ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে যায় নি, দেহ লাউয়ের তৈরি এবং ব্রিজটি প্রকৃত অর্থে জওয়ারি বিশিষ্টা অর্থাৎ চওড়া এবং উপরিভাগ সমতল। এই বৈশিষ্ট্যগুলো বলে দেয় যে, যন্ত্রটি তত্তালে প্রচলিত ‘তম্বুর এর চেয়ে পৃথক।

 

 

অর্থাৎ তম্বুর থেকে এক বা একাধিক ধাপে বিবর্তন ঘটে ইতোমধ্যে অনিবন্ধ ও নিবন্ধ তানপুরার উৎপত্তি হয়েছে, নিবন্ধ তানপুরায় পরবর্তীকালে বাজাবার পদ্ধতি, সুর মেলানোর পদ্ধতি ইত্যাদির বিশেষ কিছু কৌশল যুক্ত হয়েছে যা তম্বুর বাজানোর কৌশলের মত নয়, বরং সেতারের মত। এই কৌশলের প্রয়োজনেই তমুরের আকার পরিবর্তিত হয়েছে। চিত্র থেকে প্রাপ্ত এত সব ধারাবাহিক পরিবর্তন ও বিবর্তনের পর প্রশ্ন জাগতে পারে যে, সেতার যন্ত্রটি কি তদুর যজ্ঞের সরাসরি পরিমার্জিত রূপ?

এক কথায় এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহ থেকে অনেক বিশ্লেষণের পরও কোন গবেষক তম্বুর এবং সেতার – এ দু’টি যজ্ঞের মধ্যে সরাসরি কোন যোগসূত্র আবস্কার করে দেখাতে পারেন নি। বরং এই দুই যন্ত্রের মধ্যে আকেটি যন্ত্রের প্রভাব ঐতিহাসিকভাবে স্বীকার করে নিতে হয়, তা হচ্ছে কাশ্মিরী সেতার।

মিঞা তানসেনের জামাতা নৌবাৎ খাঁর পঞ্চদশ প্রজন্যের বংশধর খসরু বা (আমীর খসরু নামেও পরিচিত) কাশ্মিরী সেতার নিয়ে নানাবিধ গবেষণা করার পর সেতার উদ্ভাবন করেন। সংগীত শিল্পীদের পরিবারে সংগীতের যে ইতিহাস মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে এসেছে তা থেকেও এ ধরণের তথ্য পাওয়া যায়।

 

 

১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে কোলকাতায় সংগীত গবেষক এলাইন মাইনারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওস্তাদ ওমর খান উল্লেখ করেছেন যে, সেতারের আবিস্কারক খসরু খান কিছুকাল কাশ্মীরে আবস্থান করেছিলেন এবং সেখান থেকেই সেতার যন্ত্রটি আবিস্কারের ধারণা নিয়ে দিল্লীতে ফিরে আসেন। কাশ্মিরের ১৮ শতকের চিত্রকর্মসমূহে এই সেহতার যন্ত্রটির কোন ছবি দেখতে পাওয়া যায় নি।

এ থেকে ধারণা করো যায় যে রাজদরবারের বাইরে লোকজ এলাকায় এই যন্ত্রটির প্রচলন ছিলো। বরং পরিশীলিত সেতার হিসেবে যখন এর আবির্ভাব হলো তখন তা সহজেই উত্তর ভারতের রাজদরবার সমূহে স্থান করে নিলো। কাশ্মীরের সেতার যন্ত্রটি সরাসরি পারস্য সেতার যন্ত্র থেকে এসেছে। এটি পারস্যের সুফী সংগীতের সাথে সম্পৃক্ত। কাশ্মিরী সেতার যন্ত্রের দেহ কাঠের তৈরি, অস্ত্রী তার দিয়ে এর পর্দা তৈরি হয়, তার থাকে সাত থেকে নয়টি।

ছয়টি তারকে নির্দিষ্ট স্কেলে সুর মিলিয়ে বাঁধা হয়, যেগুলো বাঁ হাত দিয়ে বাজাতে হয় না, মূল তার বাজাবার সময় শুধু টোকা দেওয়া হয় (অর্থাৎ ড্রোন হিসেবে ব্যবহৃত হয়)। সবশেষের তার দু’টি জোড়া তার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, অর্থাৎ তার দু’টি খুব কাছাকাছি থাকে এবং সর্বদা একসঙ্গে বাজানো হয়। এই তার জোড়াতেই মূল সুর বাজানো হয়। তারের সংখ্যা কম হলে দণ্ডটি সরু হয়, বেশি হলে দণ্ডটি চওড়া হয়।

পারস্য সেতারের দণ্ড সরু হতো এবং কাশ্মিরের সেহতারও প্রথম যুগে সে রকমই ছিলো। এগুলো আকারে বর্তমান সেতারের চেয়ে ছোট। কশ্মিরে বর্তমান যুগেও কাশ্মিরী সেতারের চল রয়েছে।

 

চিত্র – কাশ্মিরী সেতার

কাশ্মিরে এই সেতার সেতার অথবা সেতার নামে পরিচিত। সেতারের নাম এবং নামের বানান সম্পর্কে এখানে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করা খুব জরুরী। সেতার যন্ত্রের নামের উৎপত্তি পারসা দু’টি শব্দ সেহ (অর্থাৎ তিন) এবং তার (অর্থাৎ তন্ত্রী) থেকে। পরবর্তীকালে সেহতার নামটি সহজ হয়ে শুধু সেতার নামে পরিচিত হয়। নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক যুগে আমরা যে সেতার পেয়েছি সেটি এখন এই নামে পরিচিত।

এর তারের সংখ্যাও এখন আর তিন নয়, আরো বেশি। উল্লেখ করা প্রয়োজন, এর ইংরেজি নামকরণ করা হয় Sitar এবং সেতারের ইংরেজি নামের এই বানানটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি এবং প্রচার লাভ করে। অপরদিকে ‘সেইতার’ নাম নিয়ে তুলনামূলক অপরিশীলিত একটি রূপ পারস্য, কাশ্মির ইত্যাদি অঞ্চলে প্রচলিত রয়ে যায়। ইংরেজিতে এর বানান লেখা হয় Setar।

অনলাইনে সর্বাধিক প্রচলিত এনসাইক্লোপিডিয়া উইকিপিডিয়া সহ ইন্টারনেটের সকল তথ্য উৎস এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সকল প্রকাশনায় দু’টি বানানের ভিন্নতা বজায় রেখে দু’টি পৃথক বাদ্যযন্ত্রকে নির্দেশ করা হয়। তবে বাংলায় ‘সিতার’ লেখার চল নাই। সেজন্য ‘সেতার’ শব্দ দ্বারা দু’টি যন্ত্রকেই নির্দেশ করলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।

বাংলায় প্রচলিত ‘সেতার’ শব্দটিকে আধুনিক কালে বিশ্বব্যাপি জনপ্রিয় সেতার যন্ত্রের জন্য নির্দিষ্ট রেখেই পারস্য যন্ত্রটিকে ‘সেইতার’ বলে বর্তমান রচনায় উল্লেখ করা হলো। ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিবরণসূহে এই যজ্ঞটিন নামের বানান কখনো Setar এবং কখনো Sehtar লেখা হয়।

পরিশেষে বলা যায়, পারস্য কোন যন্ত্রের প্রভাবে সেতারের উৎপত্তি সে বিষয়ে এক কথায় কোন উপসংহার দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ কোন একটি যন্ত্রের রূপান্তর নয়, বরং একাধিক যন্ত্রের প্রভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক সেতার পাওয়া যায়। এ কারণে চতুর্থ অনুমানটিকে যুক্তির সাথে বিশ্লেষণ করা দরকার ।

 

আরও দেখুন :

ত্রিতন্ত্রী বীনা এবং সেতার

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় ত্রিতন্ত্রী বীনা এবং সেতার। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শার্সদের রচিত ‘সংগীতরত্নাকর’ গ্রন্থটিতে ত্রিতন্ত্রী বীণার উল্লেখ অনেক গবেষককে ত্রিতন্ত্রী বীণার সাথে সেতারকে সম্পর্কযুক্ত করতে উৎসাহিত করে। বৈদিক যুগের এই বাদ্যযন্ত্রের সাথে সেতারকে সম্পর্কযুক্ত করতে গিয়ে শৌরিন্দ্র মোহন ঠাকুর ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে রচিত ‘যন্ত্র ক্ষেত্র দিপীকা’ গ্রন্থে দাবী করেছেন যে আমীর খসরু ত্রিতন্ত্রী বীণাকেই সেতার নামকরণ করেছেন।

ত্রিতন্ত্রী বীনা এবং সেতার

 

বিষয়টি সমগ্র ইতিহাসকে আরো ঘোলাটে করে তুলেছে বলে মত প্রকাশ করেছেন সংগীত গবেষক ড. পিটার কুটচি। কারণ প্রাচীণ মন্দিরের চিত্রকলা অথবা যুগল চিত্রকলায় অনুসন্ধান করলে কেবল অষ্টাদশ শতাব্দীর চিত্রকর্মে আধুনিক সেতার জাতীয় কোন বাদ্যযন্ত্রের অবয়ব পরিলক্ষিত হয়।

শৌরিন্দ্র মোহন ঠাকুরের মত অধ্যাপক লালমণি মিশ্র তাঁর ভারতীয় সংগীত বাদ্য’ গ্রন্থে ‘ত্রিতন্ত্রী বীণা থেকে সেতারের উৎস খোঁজার চেষ্টা করেছেন মাঝখানে ‘যন্তর’ নামে একটি বাদ্যযন্ত্রকে মাধ্যম হিসেবে রেখে। ‘সংগীতরত্নাকরা এবং ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থ দু’টির উপর ভিত্তি করে তাঁর যুক্তি হলো ‘ত্রিতন্ত্রী বীনা পরবর্তীকালে ‘যন্ত্রর’ নামে পরিচিত হয় এবং ‘যন্ত্রর’ হলো সেতারের আদি নাম।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শাঙ্গদের রচিত গ্রন্থে ত্রিতন্ত্রী বীণার নাম উল্লেখ আছে কিন্তু কোন বর্ণনা নাই। পঞ্চদশ শতাব্দীতে টীকাকার কল্লিনাথ বলেন যে, ‘ত্রিতন্ত্রী বীণার জনপ্রিয় নাম হচ্ছে ‘যন্তর’। সে সময়ে ত্রিতন্ত্রী বীণা সম্ভবত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিলো, অন্তত নামের দিক থেকে, কারণ কল্পিনাথের পরবর্তী সময়ে এই নামে কোন যন্ত্রের নাম পাওয়া যায় না। অপরপক্ষে ষোড়শ শতাব্দীতে আবুল ফজল রচিত ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে ‘যন্তর’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

 

সে সময়ে এটি সম্রাট আকবরের রাজদরবারে একটি প্রধাণ বাদ্যযন্ত্র হিসেবে পরিগণিত হতো। আবুল ফজলের রচনা থেকে ‘যন্ত্রর’ এবং ‘বীণ’এর বর্ণনা উদ্ধৃত করা হলো –

“যন্তর এক গজ দীর্ঘ ফাঁপা কাঠের গলা দিয়ে তৈরি। দু’প্রান্তে আধখানা লাউ সংযুক্ত। গলার উপরে ষোলটি পর্দা। এর উপর দিয়ে পাঁচটা তার গেছে। তারগুলি দু’দিকেই বাঁধা। পর্দার বিন্যাসের দ্বারা তীব্র ও কোমল স্বর এবং তাদের বৈচিত্র সৃষ্টি করা হয়।”

“বীণা প্রায় যস্তরের অনুরূপ, কিন্তু তিনটি তারযুক্ত সম্রাট আকবরের আমলের ‘যন্ত্রর’ আর কল্লিনাথ উল্লিখিত ‘যন্ত্রর’ হয়তো একই ছিলো, এমনকি শাঙ্গদেবের ‘ত্রিতন্ত্রী’র সাথেও এর কোন সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ‘আইন-ই- আকবরী’তে উল্লিখিত ‘যন্তর’ ছিলো একটি দণ্ডাকৃতি জিথার, যা উত্তর ভারতে অত্যন্ত প্রচলিত ছিলো। ‘বীণা’ নামে।

অথচ সেতার একটি লিউট গোত্রের বাদ্যযন্ত্র। সেতারের সাথে জিহ্বার গোত্রভুক্ত যন্তর এর আকৃতিগত কোন মিল নাই। উপরন্তু যন্তর বীণার থেকেও পৃথক এ কারণে যে, এতে সংযুক্ত লাউ দু’টি অর্ধেক করে কাটা, বীণা বা জনপ্রিয় ‘বীণ’-এর মত সম্পূর্ণ লাউ এই যন্ত্রের তুম্বা হিসেবে সংযুক্ত নয়। পরবর্তীকালে বীণের জনপ্রিয়তা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায় এবং সমগ্র উত্তর ভারতে এর বহুল ব্যবহার দেখা যায়, পক্ষান্তরে ‘যন্তর এর ব্যবহার কমে আসে।

শুধু রাজস্থানের লোক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ‘যন্তর’ এখনও টিকে আছে, সেটি আকারে একটি ছোট বীণের মত। ড.এলাইন মাইনার বিভিন্ন গবেষকদের গবেষণা পর্যালোচনা করে মন্তব্য করেছেন যে, কোথাও যন্ত্রর’ এর সাথে সেতার কিংবা ‘ত্রিতন্ত্রী বীণার কোন সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় নি। ত্রিতন্ত্রী অর্থ তিন তার বিশিষ্ট যন্ত্র। অপরদিকে ফারসী ভাষায় সেতার অর্থও তাই (সেহ = তিন, তার = তন্ত্রী)।

 

 

নামের অর্থগত মিল সম্ভবত গবেষকদের এই দু’টি যন্ত্রের সাথে সম্পর্ক আবিস্কারে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। এছাড়া আকার আকৃতির দিক থেকে এবং শ্রেণীবিন্যাসের ভিত্তিতে দু’টি যন্ত্রের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং ত্রিতন্ত্রী বীণা থেকে সেতার উদ্ভাবনের অনুকূলেও কোন যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।

 

আরও দেখুন :

প্রচলিত তত যন্ত্র সেতার

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় প্রচলিত তত যন্ত্র সেতার বর্তমান যুগে আমাদের দেশে উচ্চাঙ্গ সংগীতের জগতে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে আলোচিত বাদ্যযন্ত্র হচ্ছে সেতার। সেতার বাজানোর মূল কৌশলগুলো বীণার অনরূপ। তবে বীণার সাথে এর গঠনগত পার্থক্য রয়েছে। এছাড়া আকার ও আয়তনের দিক থেকে সেতার অনেক সুবিধাজনক এবং সহজে বহনযোগ্য। সেতারের বর্তমান রূপলাভের পেছনে রয়েছে বিবর্তনের এক দীর্ঘ ইতিহাস। সেতারের আবির্ভাব বিষয়ে চারটি অনুমানের কথা উল্লেখ করা যায়।

প্রচলিত তত যন্ত্র সেতার

 

 

প্রথম অনুমান হচ্ছে, প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের কোন এক প্রকার বীণা পরিবর্তন এবং পরিবর্ধনের মাধ্যমে বর্তমান সেতারে পরিণত হয়েছে। এই অনুমান যারা সমর্থন করেন তাদের মধ্যে ত্রিতন্ত্রী বীণার সাথে সেতারকে সম্পর্কযুক্ত করার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় অনুমান হচ্ছে, খ্রিস্টীয় নবম এবং দশম শতাব্দীতে প্রাচীন ভারতীয় মন্দিরে খচিত ভাস্কর্যে লম্বা গলার লিউট জাতীয় বীণার চিত্র দেখা যায়।

এ থেকে ধারণা করা যেতে পারে প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে সেতার জাতীয় যন্ত্রের প্রচলন ছিলো। এ প্রসঙ্গে নির্দিষ্ট করে কোন বীণার নাম উল্লেখ করা যায় না, তবে ঐ সকল ভাস্কর্যে যে লম্বা গলার লিউটের ছবি পাওয়া গেছে তার সাথে সেতারের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি গবেষকদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তৃতীয় অনুমান হচ্ছে, উপমহাদেশের বাইরে থেকে আগত কিছু বাদ্যযন্ত্র সেতার উদ্ভাবনকে প্রভাবিত করেছে।

 

 

সেতারের আবিস্কারে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার প্রভাবের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন অখণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে মুসলিম শাসকদের আগমন শুরু হয় খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর শুরু থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্দশ এবং পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে।

উত্তর পশ্চিম উপকূলের মাধ্যমে মূলত এসব বহিরাগত শাসসকদের আগমণ ঘটে, সেইসাথে সংগীত, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক রীতি নীতি সবকিছুতেই ধীরে ধীরে পারস্য এবং মধ্য এশিয়ার সংস্কৃতির প্রভাব যুক্ত হতে থাকে। এ সময়ে তারের কয়েকটি মনোকর্ড জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের আগমন ঘটে এদেশে। এর মধ্যে পারস্যের ‘সেতার’ এবং ‘তম্বুর’ এবং উজবেকিস্তারেন ‘দুতার’ যন্ত্রকে সেতারের পূর্বসূরী মনে করা হয়।

এসব যন্ত্রের চিত্র দেখে সেতারের সাথে কোন কোন অংশে বেশ মিল পাওয়া যায়। যে কারণে এদের মধ্যে একটা সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা যেতে পারে। চতুর্থ অনুমান হচ্ছে, শুধু প্রাচীন উপমহাদেশীয় কোন যন্ত্র নয়, কিংবা শুধু উপমহাদেশের বাইরের কোন যন্ত্রের প্রভাবে নয়, বরং উপমহাদেশীয় বাদ্যযন্ত্র এবং উপমহাদেশের বাইরে থেকে আগত বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধনে সেতারের সৃষ্টি হয়েছে।

 

 

এখানে পারস্য ‘সেতার’ বা ‘তম্বুর জাতীয় যন্ত্র এবং উপমহাদেশীয় ‘বীণা’ জাতীয় যন্ত্রের আদানপ্রদানজনিত বিবর্তনের বিষয়টি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। প্রতিটি অনুমান পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।

আরও দেখুন :

বাদ্যযন্ত্রের কালানুক্রমিক বিবর্তনের ইতিহাস

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় বাদ্যযন্ত্রের কালানুক্রমিক বিবর্তনের ইতিহাস। প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে সব ধরণের তারের যন্ত্র বীণা নামে পরিচিত ছিলো। মনোকর্ড অথবা পলিকার্ড, ছড় দিয়ে বাজানোর যন্ত্র অথবা টোকা দিয়ে বাজানোর যন্ত্র, পর্দাযুক্ত অথবা পর্দাবিহীন যন্ত্র সবই এর অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এর মধ্যে কোনটা ছিলো জিথার দলভুক্ত, কোনটা লিউট দলভুক্ত। ভরত রচিত ‘নাট্যশাস্ত্র’ গ্রন্থে বিভিন্ন প্রকার বীণার নাম পাওয়া যায়। তবে কোনটি কোন ধরণের হতে পারে তা বলা হয় নি।

বাদ্যযন্ত্রের কালানুক্রমিক বিবর্তনের ইতিহাস

তেমনি ‘সংগীত মকবুল’ গ্রন্থে উনিশটি সংগীতপনিষতসারদ্ধার’ গ্রন্থে তেরটি এবং ‘সংগীতরত্নাকর’ গ্রন্থে দশটি বাঁণার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আকার ভেদে কোনটি কোন দলভুক্ত হতে পারে সে বিষয়ে বিশদ বিবরণ নাই। গঠন নির্বিশেষ সবগুলোই বীণা। পরবর্তীকালে নাট্যশাস্ত্রের টীকাকার কল্পিনাথ নাট্যশাস্ত্রে বর্ণিত বীণাগুলোর ব্যাখ্যা দান করেছেন।

‘চিত্রা’ এবং ‘বিপক্ষী হার্পের মত পলিকর্ড জাতীয় বীণা। ‘রুদ্রবীণা’ এবং ‘স্বরস্বতী বীণা মনোকর্ড জাতীয়। আবার ‘রাবন হস্ত বীণা” এবং ‘পিনাকী বীণা’ হচ্ছে ছড় দিয়ে বাজানো হয় এমন ধরণের যন্ত্র। বেহালার সাথে এগুলোর তুলনা করা যেতে পারে। আধুনিক যুগে আমরা এগুলোকে বীণা বলে ভাবতে পারি না। আবার ‘নাগস্বরম’ বা “শানাই এর মত শুষির বাদ্যযন্ত্র পরিচিত ‘মুখরীণা’ হিসেবে।

আজও ‘বীণ’ বলতে ‘রুদ্রবীণা’ এবং সাপুড়ের বাঁশি দু’টোকেই বোঝানো হয়। ৯৬ বিষয়টি বাদ্যযন্ত্রের বিবর্তন উদ্ঘাটনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।

এ কারণে বি.সি. দেব তাঁর ‘ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র’ গ্রন্থে লিখেছেন “প্রাচীন পুস্তকে এই শব্দটি (অর্থাৎ বীণা) পেয়ে যদি কোন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত করেন যে, আধুনিক বীণার ঐতিহ্য (আধুনিক বলতে এখানে রুদ্রবীণা অথবা তাঞ্জৌরী বাঁধার মত তুলনামূলক আধুনিক যুগের বাদ্যযন্ত্রের কথা বোঝানো হয়েছে) অতি পুরাতন, তিনি হয়তো ভুল করবেন। কারণ, এই পুরাতন শব্দটি সম্ভবত হার্প জাতীয় অন্য কিছু বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। ”

এই কারণে অত্যন্ত সতর্কভাবে বাদ্যযন্ত্রের ইতিহাস অনুসন্ধান করা দরকার। প্রাচীন নিদর্শন এবং ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে বাদ্যযন্ত্রগুলোর বিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে এদের গঠনগত পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসা তাই খুব জরুরী।
মধ্যযুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগীত বিষয়ক রচনা হচ্ছে শাঈদের রচিত ‘সংগীতরত্নাকর’। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এটি রচিত হয়।

এই গ্রন্থে শাঈদের প্রাথমিক যুগের একটি বাঁণাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করছেন, এর নাম ‘একতন্ত্রী বীণা’। শাঙ্গদেবের মতে এটি তখনকার সময়ে বীণা জাতীয় যন্ত্রের মধ্যে প্রধাণ হিসেবে পরিগণিত হতো। এটি উল্লেখযোগ্য এ কারণে যে, এটিই প্রথম এক তার বিশিষ্ট ফিংগারবোর্ড যন্ত্র যাতে সুর বাজানো যায়। মনোকার্ড যন্ত্র হিসেবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার। কারণ এর পূর্ববর্তী যন্ত্রগুলো ছিলো পলিকার্ড জাতীয়।

একাধিক তারকে বিভিন্ন সুরে বেঁধে নিয়ে এসব পলিকার্ড জাতীয় বীণা বাজানো হতো। এইসব যন্ত্রে এক একটি সুরের জন্য এক একটি তার ব্যবহৃত হতো। আলাদাভাবে বিভিন্ন তারে টোকা দিয়ে এইনর বীণা বাজনো হতো। বাঁ হাতের আঙুলের সাহায্যে ফিংগারবোর্ডে তার চেপে কার্যত এর দৈর্ঘ্য কম বেশি করে বিভিন্ন সুর উৎপন্ন করার ব্যবস্থা এসব বীণায় ছিলো না। এ পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে আধুনিক।

তারের যন্ত্রে পর্দা (ফ্রেট) ব্যবহার করে অথবা অথবা পর্দাবিহীন যজ্ঞে ফিংগারবোর্ডের উপরে আঙুল চেপে কার্যত তারের দৈর্ঘ্য কমানো অথবা বাড়ানো হয়। ইংরেজিতে একে বলে Active vibration length । এক পর্দা থেকে আরেক পর্দায় আঙুল সরিয়ে নিলে Active vibration length পরিবর্তিত হয়। খাদের সুর বাজাতে হলে Active vibration length দীর্ঘ হওয়া দরকার।

আবার চড়া সুর বাজাতে হলে Active vibration length খাটো হওয়া দরকার। এই প্রয়োজন অনুসারে ফিংগাবোর্ডে অঙ্গুলি সঞ্চালন করতে হয়। ভরত বর্ণিত ঘোষ বীণা অথবা ঘোষিকা বাঁধার পরিমার্জিত রূপ ছিলো একতন্ত্রী বীণা। এটি ছিলো শিখার গোত্রের বাদ্যযন্ত্র। ডান হাতের আঙুল দিয়ে তারে আঘাত করে একতন্ত্রী বীণা বাজানো হতো। বাঁ হাতের তিনটি আঙুল তর্জনী, মধ্যমা এবং অনামিকার সাহায্যে ফিংগারবোর্ডে তার চেপে যন্ত্রটি বাজানো হতো।

তবে বাজানোর সময়ে বাঁ হাতের আঙুলে পাতলা এক খণ্ড বাঁশের চটা বেঁধে নেওয়া হতো। বাঁ হাতের সাহায্যে তারের দৈর্ঘ্য কম বেশি করে যজ্ঞে সুর তোলার কারণে এটি একটি উৎকৃষ্ট যন্ত্র হিসেবে সমাদর লাভ করে হার্প জাতীয় অন্যান্য যজ্ঞের তুলনায়। পর্দাবিহীন হওয়ার কারণে দক্ষ শিল্পীরা এতে সূক্ষতম শ্রুতি পরিবেশন করতে পারতেন। ভরতের ‘নাট্যশাস্ত্র’-এর আমল থেকে শাস্ত্রদেবের ‘সংগীতরত্নাকর – এর রচনাকাল পর্যন্ত এটি প্রায় হাজার বছর ধরে প্রচলিত ছিলো।

পঞ্চম শতাব্দীর শেষ দিকে এসে এটি অন্যতম প্রধাণ বাঁণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দীতেও একতন্ত্রী বীণা সমান জনপ্রিয় ছিলো। ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দীর শেষদিকে কিন্নরী বীণার উন্নততর সংস্করণ আবিস্কার হওয়ার কারণে ধীরে ধীরে একতন্ত্রী বীণার জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। কিন্নরী বীণা ছিলো ফ্রেটযুক্ত জিয়ার। কিন্নরী বাঁধার কয়েকটি রূপ প্রচলিত ছিলো।

এর কোনটি লোক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে এবং কোনটি উচ্চাঙ্গ বাদ্যযন্ত্র হিসেবে পরিগণিত হতো। ঐতিহাসিক আবুল ফজলের রচনায় যে ধরণের বিশ্বরী বীণার উল্লেখ করা হয়েছে তাতে দু’টি তার এবং তিনটি লাউ ব্যবহার করা হতো। আরো পরে কিন্নরী বীণার উন্নততর সংস্করণ হিসেবে রুদ্র বীণা এবং স্বরস্বতী বীণার আবির্ভাব হয়। কিন্নরী বীণায় চৌদ্দটি পর্দা থাকতো, এগুলো সরানো যেতো। রুদ্র বীণায় পর্দার সংখ্যা হলো বাইশটি।

 

 

এগুলো বাঁশের গায়ে মোম দিয়ে আটকিয়ে দেওয়া হতো। দক্ষিণ ভারতে ক্রমান্বয়ে পর্দাযুক্ত বীণার নানা পরিবর্তন এবং বিবর্তন সাধিত হতে থাকে যা পরবর্তীকালে স্বরস্বতী অথবা তাঞ্জৌরী বীনার রূপ লাভ করে। রুদ্র বীণা নামের উল্লেখ সর্বপ্রথম পাওয়া যায় নারদ রচিত ‘সংগীত মকরন্দ গ্রন্থে। কিন্নরী বীণায় সাথে রুদ্র বীণার মূল পার্থকা দু’টি। প্রথমটি হচ্ছে পর্দার সংখ্যা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে লাউয়ের সংখ্যা।

কিন্নরী বীণার তুলনায় রুদ্র বীণায় পর্দার সংখ্যা আটটি বেশি এবং এগুলোর বিন্যাসেও পার্থক্য বিদ্যমান। রুদ্রবীণায় বারোটি স্বরের প্রত্যেকটির জন্য পৃথক পৃথক পর্দা থাকে। এই কারণে পর্দা না সরিয়েও এই যন্ত্রে যে কোন রাগ পরিবশেন করা যায়। এছাড়া কিন্নরী বীণায় তিনটি লাউ ব্যবহৃত হতো। সকল বাদ্যযন্ত্র রুদ্রবীণায় লাউয়ের তুম্মা রইলো দু’টি। ক্রমে রুদ্র বীণা উপমহাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় বীণায় পরিণত হয় এবং সংক্ষেপে শুধু ‘বীণ’ নামে পরিচিত হয়।

এর জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বীণা বলতে আধুনিক যুগে শুধু রুদ্র বীণাকেই বোঝায়। রুদ্র বীণার দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে তিন ফুট। এর দৈর্ঘ্য বলতে প্রকৃতপক্ষে এর ফিংগারবোর্ডের দৈর্ঘাকেই বোঝায়। সকল বাদ্যযন্ত্র এটি বাঁশের তৈরি। এর পেছন দিকে দু’টি লাউয়ের তুম্মা সংযুক্ত থাকে। লাউয়ের ব্যাস সাধারণত চৌদ্দ ইঞ্চি। তবে বাঁশ খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং প্রতি বছর পরিবর্তন করতে হয় বলে আধুনিক যুগে বাঁশের পরিবর্তে সেগুন কাঠের ফিংগারবোর্ড ব্যবহৃত হয়।

রুদ্রবীণার পর্দাগুলো কাঠের তৈরি। বিশেষভাবে তৈরি এক ধরণের মোম দিয়ে এগুলো ফিংগারবোর্ডের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেকটি পর্দার উপরে পিতলের পাতলা পাত লাগানো হয়। বাদকের ইচ্ছা অনুযায়ী পর্দার সংখ্যা কম অথবা বেশি হতে পারে।
রুদ্র বীণায় তার থাকে সাতটি। চারটি মূল তার। বাকী তিনটি শ্রুতি তন্ত্রী অর্থাৎ ড্রোন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে দু’টি লাগানো হয় বাঁণার ডান পাশে এবং একটি লাগানো হয় বাম পাশে।

এতক্ষণ যে সকল বাদ্যযন্ত্রের কথা বলা হলো সেগুলো সব জিথার গোত্রের। এগুলো ছাড়াও প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে লিউট জাতীয় যন্ত্রেরও কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ শতাব্দী সময়ের মধ্যে অজন্তা, নাগার্জুনকরা এবং অমরাবতীর গুহাচিত্রে অঙ্কিত ভাস্কর্য এবং দেয়ালচিত্রে স্পষ্টভাবে লিউট জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের চিত্র পাওয়া যায়।

নাট্যশাস্ত্রের টাকাকার অভিনব গুপ্ত সকল বাদ্যযন্ত্রকে তিনটি গোত্রে বিভক্ত করেছিলেন – (১) বক্র, (২) কুর্মি এবং (৩) অলাবু। কুর্মি অর্থ কাপ, – সুতরাং যে সব যন্ত্রের দেহ গোলাকার এবং চেষ্টা, নাতিদীর্ঘ ফিংগারবোর্ড বিশিষ্ট সেই সকল সঙ্গকে তিনি দ্বিতীয় গোত্রভুক্ত বলে বর্ণনা করেছেন। অজন্তা, নাগার্জুনকরা এবং অমরাবতীর চিত্রগুলোতে যে ধরণের লিউটের ছবি পাওয় যায় তা হুবহু অভিনব গুপ্তর বর্ণনার সাথে মিলে যায়।

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে মধ্য প্রদেশের একটি বৃন্দ বাদনের চিত্রে দেখা যায় একজন মহিলা বাদক কোলে একটি লিউট ধরণের যন্ত্র নিয়ে বাজাচ্ছে। ছবিটি এত স্পষ্ট যে, এতে অঙ্কিত তারের সংখ্যাও শুনে দেখা যায় যে যন্ত্রটিতে সাতটি তার রয়েছে। চিত্রে বাদক তার ডান হাত দিয়ে যন্ত্রের তারে টোকা দিচ্ছে এবং বাঁ হাত দিয়ে তার চেপে ধরেছে। যন্ত্রটির ফিগারবোর্ডে কোন পর্দা নাই। ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্রে উল্লেখ করেছিলেন যে চিত্রা বীণা সাত তার বিশিষ্ট।

সম্ভবত সেই কথার উপর ভিত্তি করে অধ্যাপক লাল মণি মিশ্র এবং ড.বি.সি. দেব এই যন্ত্রটিকে চিত্রা বাঁণা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ঐতিহাসিক নিদর্শনে এইসব বাদ্যযন্ত্রের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার কারণে বাস্তবে সকল বাদ্যযন্ত্র এ ধরণের যন্ত্রের উপস্থিতি সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়। যদিও তদানীন্তন সংগীতের ইতিহাসে পণ্ডাকৃতি জিগারের তুলনায় এগুলোর উপস্থিতি খুবই নগন্য।

সংগীতের ইতিহাসে দীর্ঘদিন এ ধরণের যন্ত্রের বহুল ব্যবহার চোখে না পড়লেও এই ধরণের যন্ত্র থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে সংগীতের ইতিহাসে উদ্ভব হয়েছে রবাব নামক যন্ত্রের। সংগীতের ইতিহাসে এটি একটি প্রধান বাদ্যযন্ত্র হিসেবে পরিগণিত। সম্রাট আকবরের আমলে যন্ত্রটি উৎকর্ষ লাভ করে। তাঁর দরবারের সভা সংগীতজ্ঞ মিঞা তানসেন অসাধারণ রবাব বাজাতে পারতেন।

 

 

রবারের একাধিক সংস্করণ রয়েছে। মিঞা তানসেন যে ধরণের রবাব বাজাতেন সেটি তাঁর নামের অনুসরণে সেনিয়া রবার নামে পরিচিত। এর অপর নাম ধ্রুপদী রবার। চিত্রা বীণার কোন একটি সংস্করণ থেকে পরিমার্জনের মাধ্যমে মিঞা তানসেন একে ধ্রুপদী সংগীতের উপযোগী করে তোলেন বলে “অধ্যাপক লাল মণি মিশ্র দৃঢ়ভাবে মতামত ব্যক্ত করেেছন। ধ্রুপদী রবাবের দৈর্ঘ্য তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট হয়ে থাকে।

আরও দেখুন :

বাদ্যযন্ত্রের বিবর্তনের কালানুক্রমিক ইতিহাস পর্যালোচনা

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় বাদ্যযন্ত্রের বিবর্তনের কালানুক্রমিক ইতিহাস পর্যালোচনা। ভৌগোলিক পরিসরের বিবেচনায় আমাদের দেশ যেখানে অবস্থিত তা এক সময়ে অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশ হিসেবে পরিগণিত ছিলো। সমগ্র অঞ্চলের সংগীত এক অভিন্ন বৈশিষ্ট্য বহন করে। শুধুমাত্র দক্ষিণ ভারতের কিছু স্থান ব্যতীত ভারতীয় উপমহাদেশের সমগ্র এলাকার উচ্চাঙ্গ সংগীত এক এবং অভিন্ন। উচ্চাঙ্গ সংগীতের এই ধারা হিন্দুস্তানী উচ্চাঙ্গ সংগীত নামে পরিচিত।

বাদ্যযন্ত্রের বিবর্তনের কালানুক্রমিক ইতিহাস পর্যালোচনা

 

সুরের সন্ধানে সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার নবীনগনের থানার শিবপুর গ্রামের গৃহত্যাগ করে সুদূর কোলকাতা, উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন রাজ্যে গমন করে সংগীত শিক্ষা গ্রহণের ইতিহাস থেকেও আমরা সংগীতের এই অভিন্নতার প্রমাণ পাই। ওস্তাদ আলাউদ্দিন বা সংগীতের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন তাঁর অগ্রজ ফকির তাপস) আফতাবউদ্দিন খাঁর কাছে।

তাঁর কাছে স্বর সাধনা এবং তালযন্ত্রের প্রাথমিক পাঠ নিয়ে তিনি এই সংগীতে পরিপূর্ণ শিক্ষা লাভের অদম্য আকাঙ্খা নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন। অগ্রজর কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার ধারাবাহিকতায় তিনি এরপর একের পর এক ওস্তাদের কাছে তালিম গ্রহণ করেন। প্রথমে কোলকাতায় একাধিক ওস্তাদের কাছে কণ্ঠ এবং বিভিন্ন যন্ত্রে তালিম গ্রহণ করেন। পরে ছুটে যান উত্তরপ্রদেশের রামপুরে।

 

 

সেখানে মিঞা তানসেনের বংশধর ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিন কর্মজীবন অতিবাহিত করেন মাইহার রাজ্যে। একই গুরু ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করে তাঁর অনুজ ওস্তাদ আয়েত আলী বা বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং কুমিল্লায় সংগীত শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন।

দুইজন দুই জায়গায় অবস্থান করলেও পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁরা উপমহাদেশে প্রচলিত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের নবরূপ দান করেছেন এবং নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্র আবিস্কার করেছেন। তাঁদের এই গবেষণার কথা অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। বর্তমান অধ্যায়ে উচ্চাঙ্গ সংগীতের অভিন্ন রূপ প্রসঙ্গে তাঁদের কথা যৎসামান্য আলোচনা করা হলো।

প্রকৃতপক্ষে উচ্চাঙ্গ সংগীতের অভিন্ন রূপ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নাই। একই ধরণের বাদ্যযন্ত্র সমগ্র অঞ্চলে প্রচলিত যাতে উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করা হয়। আপালিকভাবে কিছু লোক বাদ্যযন্ত্র প্রচলিত । উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি প্রভাবিত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র প্রচলিত রয়েছে।

 

 

বাংলাদেশেও লোকসংগীতের জগতে প্রচলিত রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু যে সকল বাদ্যযন্ত্রে উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশিত হয় তা একইভাবে সমগ্র এলাকায় প্রচলিত। কাজেই উৎস সন্ধান করতে হলে অভিন্ন ইতিহাস বিশ্লেষণই একমাত্র উপায়।

আরও দেখুন :

বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ

ধনুকাকৃতির পলিকর্ড, যার ইংরেজি নাম হার্প, বাংলায় বীণাও বলা হয়, এটি হচ্ছে পরিচিত সব থেকে প্রাচীন তত-যন্ত্র। একটি ধনুকে একটি তার যোজনা করেলে তাতে টোকা দেয়ে একটি স্বর উৎপন্ন করা যায়। একই ধনুকে অনেকগুলো তার যোজনা করলে বিভিন্ন স্বর উৎপন্ন হয়। এভাবে সৃষ্টি হয় হাপ। কাজেই একটি ধনুকের গুণের সঙ্গে অনেকগুলো সমান্তরাল তার যোজনা করলে প্রাথমিক ধরণের একটি হার্পের কাঠামো পাওয়া যায়।

ইতিহাসের প্রথম যুগে হার্প জাতীয় যন্ত্রের গঠন অনুন্নত ধরণের ছিলো, শব্দ। প্রকোষ্ঠ বলে তেমন কিছু ছিলো না। পরবর্তী সময়ে একেবারে শিকারীর ধনুকের মত তৈরি না করে ফাঁপা দন্ড দিয়ে এটি তৈরি হতে লাগলো। ফাঁপা অংশটি হলো শব্দ প্রকোষ্ঠ বা অনুনাদক এবং এর সাথে একটি ডান্ডা জুড়ে দিয়ে ধনুকাকৃতি করা হলো। এরপর এই ধনুকাকৃতির যন্ত্রে আড়াআড়িভাবে তার যোজনা করে পাওয়া গেল হার্প জাতীয় বীণা। এটি হলো প্রাচীন আমলের হার্প সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা।

এখন আমরা আলোচনা করব আধুনিক যুগের সংগীত শাস্ত্রে হার্প বলতে প্রকৃতপক্ষে কি বোঝায়। হার্প হচ্ছে এক প্রকার তারের যন্ত্র যেখানে তারগুলো শব্দ প্রকোষ্ঠের সাথে প্রায় খাড়াভাবে (লম্ব) অবস্থান করে।

 

চিত্র – ছোট আকারের হাপ

হার্পকে একটি বাদ্যযন্ত্র না বলে একে বাদ্যযন্ত্রের একটি গোত্র বলা যেতে পারে। এটি একটি পলিকর্ড জাতীয় যন্ত্র, অর্থাৎ একটি তারে একটি স্বর বাজে। এভাবে যতগুলো স্বর বাজবে ততগুলো তার থাকবে। উপমহাদেশীয় ইতিহাসের গোড়ার দিকে বীণা হিসেবে যতগুলো যন্ত্র প্রচলিত ছিলো সবই ছিলো হাপ শ্রেণীর। প্রাচীন ইতিহাস ও সংগীত শাস্ত্রে দু’রকম হার্পের কথা গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করা হয়েছে।

একটি সাত তারযুক্ত, অপরটি নয় তারযুক্ত। সাত তারযুক্ত বীণা সপ্ততন্ত্রী বীণা নামে পরিচিত। এতে সাতটি তার থাকতো, অন্যটি বিপঞ্চাবীণা, এতে নয়টি তার থাকতো। প্রথমটি আঙুল দিয়ে বাজানো হতো। পরেরটি বাজানো হতো Plectrum বা ত্রিভুজাকৃতির কাঠের টুকরা দিয়ে। ভারত ও বুদ্ধগয়ার প্রাচীন স্তম্ভে পাঁচ তারযুক্ত হার্প দেখা যায়। অবশ্য বেশি দেখা যায় সাত তারযুক্ত হার্প।

যেমন, অজন্তার (তৃতীয় খ্রিঃ পূঃ) সন্নিকটে পিতলখোরা, মধ্যপ্রদেশের সাঁচী (দ্বিতীয় খ্রিঃ পূঃ), অন্ধ্রপ্রদেশের অমরাবতী ও নাগাৰ্জ্জুনকোন্ডার (তৃতীয় খ্রিস্টাব্দ) ভাস্কর্য ও উৎকীর্ণ শিল্পে। উপমহাদেশে প্রাপ্ত বেশিরভাগ হার্প ধনুকাকৃতি বা বাঁকানো (Arched Harp)। তবে অন্য ধরণের হার্প ও ছিলো বা রয়েছে। যেমন প্রাচীনকালে একটি যন্ত্র ছিলো মত্তকোকিলা, যা বর্তমানের সুরমন্ডলের অনুরূপ।

লাইয়ার

হাপ গোত্রের খুব কাছাকাছি ধরণের আরেকটি গোত্র হচ্ছে লাইয়ার (Lyre) বা লাইয়ার জাতীয় যন্ত্র। হার্পের সাথে চেহারায় অনেক মিল থাকলেও লাইয়ার আলাদা এ কারণে যে, হার্পের তারগুলো শব্দ প্রকোষ্ঠ থেকে খাড়াখাড়িভাবে উঠে আসে, লাইয়ার-এর ক্ষেত্রে তা হয় না। এখানে একটা শব্দ প্রকোষ্ঠ তৈরি করার পর সেটির দুই প্রান্ত থেকে দু’টো বাহু বের হয়ে উপরের দিকে উঠে যায়।

দু’টো বাহুকে প্রায় শেষ প্রান্তের কাছাকাছি জায়গায় একটা ক্রসবার সংযুক্ত করে রেখেছে। এই ক্রসবারটিকে বলে Yoke (ইয়ক)। অপরদিকে নিচে যেখানে শব্দ প্রকোষ্ঠ আছে সেখানে ছোটখাটো আরেকটা ক্রসবার লাগানো হয় যেটা আসলে তারের ব্রিজ বা সওয়ারি হিসেবে কাজ করে। এই ব্রিজের নিচে বা পেছনের অংশে সংযুক্ত একটা টেলপিস বা লেঙুটে তারগুলো লাগানো হয়।

এখান থেকে ব্রিজের উপর দিয়ে তারগুলো উপরে উঠে একেবারে ইয়ক পর্যন্ত চলে যায়। ইয়কের সাথে খুঁটির সাহায্যে অথবা অন্য কোন উপায়ে তার লাগানো থাকে। আরেকটি বিষয়ের বিবেচনায় লাইয়ার হার্পের চেয়ে আলাদা, তা হলো, হার্প বাজাতে হয় আঙুলের সাহায্যে তারে টোকা দিয়ে। কিন্তু লাইয়ার বাজাতে হয় প্লেকট্রাম দিয়ে আঘাত করে (যেমন করে গিটার বাজাতে হয়)। তাছাড়া সাধারণভাবে লাইয়ার হার্পের চেয়ে আকারে অনেক ছোট হয়ে থাকে।

 

চিত্র –  ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত পাত্রের গায়ে আঁকা লাইয়ারের ছবি

এই উপমহাদেশে সম্ভবত লাইয়ার বাদ্যযন্ত্রটি ছিলো না। অথবা খুব কম প্রচলিত ছিলো। ড. বি. চৈতন্য দেব তাঁর সুদীর্ঘ গবেষণায় কেবল সিন্ধুসভ্যতার হায়ারোগ্লিফস্-এ লাইয়ার জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের অস্তিত্ত্ব অনুমান করতে পেরেছেন।

লিউট

লিউট বলতে সাধারণভাবে বোঝায় তারের যন্ত্র, যে যন্ত্রে তারে টোকা দিয়ে বা আঘাত করে বাজাতে হয় এবং যার নিচের অংশটা গোল, এই গোল অংশের সাথে লম্বা অংশ লাগানো থাকে যাতে পর্দা বা সারিকা লাগানো থাকে। তবে সব যন্ত্রে পর্দা নাও থাকতে পারে। তারগুলো তবলীর উপর দিয়ে গিয়ে লাউ বা কাঠের তৈরি শব্দ প্রকোষ্ঠ অতিক্রম করে এর নিচের দিকে লাগানো একটি টেলপিস বা লেঙুটে সংযুক্ত থাকে।

লিউট সম্পর্কে ড.বি. চৈতন্যদের বলেছেন, এটি সে ধরণের বাদ্যযন্ত্র যেখানে ফিংগারবোর্ডটি সাউন্ড বক্সের বর্ধিত অংশ মাত্র।
বর্তমানকালে বহুল ব্যবহৃত তানপুরা থেকে শুরু করে সেতার, সরোদ এবং এস্রাজ সবই লিউট গোত্রের যন্ত্র । লিউট জাতীয় যন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হলো এতে ছোট বা বড় গলা থাকবে। এই অংশটি সরাসরি শব্দ প্রকোষ্ঠের সাথে সংযুক্ত করা হয়। এই নির্মাণ কৌশলটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য এই কারণে যে, এ থেকেই সেতার, সরোদ তথা বীণা জাতীয় যাবতীয় ‘লিউট’ যন্ত্রের সূচনা।

 

চিত্র – লিউট জাতীয় কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র

প্রাচীনত্বের দিক থেকে হার্প নিঃসন্দেহে প্রাচীনতর লিউট-এর চেয়ে। তবে ঠিক কখন করে লিউট আবিস্কার হলো তা সঠিকভাবে বলা যায় না। এটুকু বলা যায়, যে খ্রিষ্টীয় দশম শতকের পর লিউট জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের বহুল ব্যবহার চোখে পড়ে।

বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত ধারণা

ধনুকাকৃতির হার্প হচ্ছে উপমহাদেশের প্রাচীনতম হার্প। এই হার্পের কিছুটা উন্নততর সংস্করণ পরবর্তীকালে আবির্ভূত হয় যা আমাদের দেশের কাছাকাছি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বর্তমানকালেও প্রচলিত রয়েছে। আমাদের দেশে এ ধরণের হার্পের ক্রমবিবর্তন হয় নি। হার্পের পরবর্তী সময়ে জিহ্বার জাতীয় বাদ্যযন্ত্র এবং তারপর লিউট জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের প্রবল জনপ্রিয়তা এবং বাদনরীতির উৎকর্ষ সাধন হচ্ছে এর মূল কারণ।

আমাদের দেশে প্রাচীন আমলে ধনুকাকৃতির হার্প সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিলো। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে সপ্ততন্ত্রী বীণা। এই যন্ত্রে সাতটি তার থাকতো। প্রাচীন ভাস্কর্যে এই যন্ত্রের যে চিত্র পাওয়া যায় তা নিম্নরূপ।

 

চিত্র – ভাস্কর্যে প্রাপ্ত সপ্ততন্ত্রী বীণার নমুনা)

প্রাচীন ভাস্কর্যে প্রাপ্ত সপ্ততন্ত্রী বীণার চিত্র লক্ষ্য করলে বোঝা যায় খুব সাধারণ কৌশলে এটি নির্মিত হয়েছে। এর নিচের দিকের মোটা অংশটি হচ্ছে শব্দ প্রকোষ্ঠ, সাধারণত ফাঁপা গাছের ডাল থেকে তৈরি। এরই এক প্রান্ত থেকে বাঁকানো একটি দণ্ড যুক্ত হয়ে ধনুকের আকৃতি সৃষ্টি করেছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী ভারগুলো শব্দ প্রকোষ্ঠের সাথে লম্বভাবে যুক্ত। প্রাচীন আমলের এই তারগুলো তৈরি হতো পশুর নাড়ী বা অস্ত্র থেকে।

এগুলোর একটি প্রান্ত শব্দ প্রকোষ্ঠ বা অনুনাদকের সাথে যুক্ত, অপর প্রান্ত বাঁধা হতো একটি চামড়ার পটির সাথে। সেই পটিটা আবার ঘুরিয়ে নিয়ে এসে দন্ডটির সঙ্গে বাঁধা হতো। লক্ষণীয় যে, যন্ত্রটিতে কোন খুঁটি বা বয়লা নাই। দন্ড বরাবর এই চামড়ার বন্ধন একটু উপরে বা নিচে করে তারের স্বরমাত্রার ওঠানামা পরিবর্তন করা হতো। অবশ্যই এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করা হতো।

প্রাচীন সপ্ততন্ত্রী বীণা থেকে তুলনামূলকভাবে আধুনিক যুগের বাদ্যযন্ত্র যেমন সেতার ও সুরবাহারের উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করে থাকেন। কিন্তু বাদ্যযন্ত্রের বিবর্তনের ধারায় বিকশিত বিভিন্ন গোত্রের (হার্প, লিউট, জিথার, লিউট) বাদ্যযন্ত্রের আবির্ভাব এবং প্রাচীন নিদর্শন থেকে এসব বাদ্যযন্ত্রের চিত্র বিশ্লেষণ করলে এ ধরণের ধারণা পোষন করার কোন অবকাশ নাই। সপ্ততন্ত্রী বীণা ছিলো ধনুকাকৃতির হার্প।

সেতার হচ্ছে লম্বা গলার লিউট। আধুনিক যুগে সেতারে মূল তারের সংখ্যা হচ্ছে সাতটি। এই সংখ্যাভিত্তিক মিল ছাড়া আর কোন মিল নাই সপ্ততন্ত্রীর সাথে। দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের যন্ত্র। বরং সপ্ততন্ত্রীর উন্নত সংস্করণ ‘সাউং গাউক’ নামক এক ধরণের ধনুকাকৃতির হার্প বর্তমান যুগে মিয়ানমারে প্রচলিত রয়েছে।

আকার ও আকৃতিতে এর বিশেষ সাদৃশ্য রয়েছে সপ্ততন্ত্রীর সাথে। মিয়ানমারের অধিবাসীরা তাদের এই ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র নিয়ে খুব গর্বিত, কারণ তারা মনে করে এই বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে তারা প্রাচীন ইতিহাসের সাথে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছে। সেতার ও সুরবাহারের মত লিউট যন্ত্রের উৎস বাস্তবসম্মত কারণেই হার্প হতে পারে না। বরং লিউট জাতীয় অন্য কোন প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রে এদের উৎস অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

উপমহাদেশের বাদ্যযন্ত্রের ইতিহাসে প্রথম যুগ ছিলো হার্প জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের। পরবর্তী যুগ হচ্ছে জিখার জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের এবং সবশেষ অর্থাৎ আধুনিক যুগ হচ্ছে লিউট জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের। প্রাচীন আমলে হার্প জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের বহুল ব্যবহারের প্রমাণ বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে আনন্দ কুমারস্বামী লিখেছেন “ভরত বর্ণিত বীণা বাদন কৌশল এবং সমসাময়িক মন্দির চিত্র থেকে এটুকু ধারণা করা যায় যে, সে আমলে প্রচলিত প্রায় সব বীণাই ছিলো হাপ গোত্রের। ”

সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংশাবশেষে যে সকল সিল মোহর পাওয়া গেছে তার মধ্যে কোন কোনটায় প্রাচীন হার্প জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের ছবি উদ্ধার করা গেছে। এগুলো ধনুকাকৃতির হার্প। এ ধরণের একটি শিলালিপির চিত্র নিচে দেওয়া হলো । প্রাচীন হার্প জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে সপ্ততন্ত্রী বীণার জনপ্রিয়তা ছিলো সবচেয়ে বেশি। এ প্রসঙ্গে স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ রচিত ‘ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হলো।

 

গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

– “খ্রীষ্টপূর্ব ১ম থেকে ৭ম শতকে ভারতবর্ষীয় সামজে সপ্ততন্ত্রী বীণার যে যথেষ্ট প্রচলন ছিলো তা নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয়। পিতলখোরার গুহায় (অজন্তার পঞ্চাশ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং ইলোরার তেইশ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বৌদ্ধস্তূপের ধ্বংশাবশেষ) যে তিনটি সাত তার যুক্ত সন্ততন্ত্রী বীণা পাওয়া গেছে এম.এন.দেশপাণ্ডে

Ancient India ( Bulletin of the Archeological Suevey of India) no. 15, 1959 সংখ্যায় “The Rock cut Caves of Pitalkhora in the Deccan প্রবন্ধে E Musicians (পৃঃ ৮৪) পর্যায়ে এর একটির বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন “The instrument, held by a youth against his right shoulder, has seven strings emanating from an elliptical gourd with a curved handle at one end, to which are tied the strings”। যন্ত্রগুলোর আকার মিশরীয় হার্পের মত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাচীন ভারতে শুধু সপ্ততন্ত্রী কেন, সকল রকম বীণার আকারই ছিলো হার্পের মত। পিতলখোরা গুহামন্দিরের তিনটি সপ্ততন্ত্রী বীণার আকৃতিও তাই। বারহুত (খ্রীস্টপূর্ব ২য় শতক), অমরাবতী (খ্রীস্টীয় ২য়-৩য় শতক), গান্ধার (খ্রীস্টীয় ৮ম শতক), বরবুদুর (খ্রীস্টীয় ৮ম শতক), কিজিল (খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতক) প্রভৃতিতে যে বীণার নিদর্শন পাওয়া যায় তাদের আকৃতিও হার্পের মত। এমন কি মুদ্রায় বাদনরত সমুদ্রগুপ্তের প্রতিকৃতিযুক্ত যে বীণার নিদর্শন পাওয়া যায় তার আকারও হার্পের মত।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে প্রায় দশম শতক অর্থাৎ তিন হাজার বছর রাজত্ব করার পর পলিকার্ড উপমহাদেশীয় সংগীত থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায় শুধু থাকে সম্ভর ও সুরমণ্ডল। মনোকর্ড জাতীয় যন্ত্র অর্থাৎ লিউট এবং লিখার জাতীয় বাদ্যযন্ত্র পরবর্তীতে প্রাধাণ্য বিস্তার করে। একটা পুরো সংগীত পদ্ধতি এভাবে পেছনে রয়ে গেল, হার্প ভিত্তিক সংগীত হলো পরিত্যক্ত এবং ‘ফিংগারবোর্ড বীণাকে অবলম্বন করে যে পদ্ধতি গড়ে উঠলো তা পুরাতন সংগীতের স্থান অধিকার করলো।

এই প্রায়-বিপ্লব পরিস্থিতি আমাদের সংগীত ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিবর্তন বলা যায়। লিউট এবং জিয়ার জাতীয় যন্ত্রে একটি তারকে বিভিন্ন পর্দার উপরে অথবা যেখানে পর্দা নাই সেখানে সরাসরি ফিংগারবোর্ডের উপরে তার চেপে অর্থাৎ তারকে থামিয়ে উঁচু এবং নিচু স্বর অর্থাৎ সপ্তকের সব কটি সুর উৎপন্ন করা যায়। ফলে এর চমৎকারিত্বে আকৃষ্ট হয়ে শিল্পী এবং গবেষকগন এই ধরণের আরো বাদ্যযন্ত্র আবিস্কারের নেশায় মেতে ওঠেন, এ ধারণা সহজেই করে নেওয়া যায়।

কালক্রমে জিখারের তুলনায় লিউট জাতীয় যন্ত্র প্রাধান্য বিস্তার করে। এসব লিউটের কোনটা তারে আঙুলের টোকা দিয়ে অথবা প্লেকট্রাম দিয়ে আঘাত করে এবং কোনটা আবার ছড়ের সাহায্যে বাজানোর রীতি প্রচলিত হয়। এভাবে লিউট গোত্রীয় বিভিন্ন যন্ত্রের প্রায় ছড়াছড়ি হয়ে যায়। ফলশ্রুতি হলো নানা ধরণের বাদ্যযন্ত্র, যেমন, তম্বুর, রবার, সুরবাহার, সুরশৃঙ্গার, সেতার, সরোদ, তাউস, দিলরুবা, এসাজ ইত্যাদি।

এই বাদ্যযন্ত্রগুলো তুলনামূলকভাবে আধুনিক। কালের বিবর্তনে এইসব বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে কোন কোনটার প্রচলন কমে আসে। কোন কোটার আবার রূপান্তর ঘটে। নানা রূপান্তর এবং আধুনিকায়নের পর এ ধরণের যে ক’টি বাদ্যযন্ত্র জনপ্রিয়তার সাথে এদেশে টিকে আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সেতার, সরোদ এবং এযান।

আরও দেখুন :

বাদ্যযন্ত্রের আকৃতি ও নির্মাণকৌশলের বিবরণ ও কালানুক্রমিক আলোচনা (বিশ্লেষণ এবং বিবর্তনের ইতিহাস)

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় বাদ্যযন্ত্রের আকৃতি ও নির্মাণকৌশলের বিবরণ ও কালানুক্রমিক আলোচনা (বিশ্লেষণ এবং বিবর্তনের ইতিহাস)

বাদ্যযন্ত্রের আকৃতি ও নির্মাণকৌশলের বিবরণ ও কালানুক্রমিক আলোচনা (বিশ্লেষণ এবং বিবর্তনের ইতিহাস)

বাদ্যযন্ত্রের আকৃতি ও নির্মাণকৌশলের বিবরণ ও কালানুক্রমিক আলোচনা (বিশ্লেষণ এবং বিবর্তনের ইতিহাস)

বাদ্যযন্ত্রের আকৃতি ও নির্মাণকৌশলের ধারাবাহিক বা কালানুক্রমিক আলোচনা করতে হলে যে বিষয় সম্পর্কে প্রথমে জানা দরকার তা হচ্ছে বাদ্যযন্ত্রের প্রকৃতি। কারণ বাদ্যযন্ত্রের প্রকৃতি এবং বাদ্যযন্ত্রের নির্মাণকৌশলের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বাদ্যযন্ত্রের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে সমগ্র বাদ্যযন্ত্রকে মূল তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। যেমন,

১। ড্রোন (Drone) বা সুর ধরে রাখার যন্ত্র

২। পলিকর্ড (Polychord) অর্থাৎ যে যন্ত্রে একটি স্বর বাজানোর জন্য একটি তার ব্যবহৃত হয় এবং

৩। মনোকর্ড (Monochord) অর্থাৎ যে যন্ত্রে একটি তার দিয়ে সব স্বর বাজানো যায়।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে বাদ্যযন্ত্রের আকৃতির ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস সহজবোধ্য হবে।

ড্রোন

এ ধরণের বাদ্যযন্ত্র কোন রাগ বা সুর সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয় না, বরং সুর ধরে রাখা ও তালের সমতা রক্ষার জন্য প্রযুক্ত হয়। যেমন একতারা ও তানপুরা। একতারায় একটি মাত্র তারই থাকে। যন্ত্রটির নিচের দিকে ছোট আকৃতির একটি লাউয়ে চামড়ার ছাউনি দেওয়া থাকে। ছাউনির সাথে কাঠ বা বাঁশের দন্ড আটকানো হয়। দন্ডটি খুব বেশি মোটা নয়। লাউটি অনুনাদক হিসেবে কাজ করে। দন্ডটি লাউয়ের নিচের দিকে একটু বেরিয়ে থাকে।

সেই বের হয়ে থাকা অংশে একটা ছোট আঙটা লাগানো থাকে। সেখান থেকে একটা তার ছাউনির ওপর দিয়ে দন্ডের প্রায় শেষ মাথা পর্যন্ত প্রসারিত। ছাউনির ওপরে এটি একটি ছোট ব্রিজের ওপর দিয়ে আসে। দন্ডের শেষ প্রান্তের কাছাকাছি এটি একটি খুঁটির সাহায্যে আটকানো হয়। খুঁটিকে মোচড় দিয়ে তারটিকে ইচ্ছামত ঢিলা বা আঁটো করা যায়।

গানের সুরের সাথে মিল রেখে এই তারের সুর বাঁধা হয়। গান গাওয়ার সময় ডান হাতের সাহায্যে টোকা দিয়ে তালে তালে শব্দ উৎপন্ন করা হয়। ফলে ছন্দোময় একটি মিষ্টি ঝঙ্কার সৃষ্টি হয়।

 

চিত্র – একতারা

তুলনামূলকভাবে একটু বড় আকারের লাউ দিয়ে তৈরি যন্ত্র ‘লাউ’ নামেই পরিচিত। গ্রাম বাংলার বাউল এবং বৈরাগীদের কাছে এটি খুবই আদরণীয়। লাউয়ের নিচের দিক কেটে চামড়ার ছাউনি দেওয়া হয়। ওপরের অংশ সমান করে কাটা হয়। লাউয়ের তৈরি এই খোলের দু’পাশে বাঁশের চটা লাগানো হয়। তবে তার আগে বাঁশের দন্ডটিকে দু’ভাগে চিরে ফেলা হয়। বাঁশের জোড়া বা গিঁটের অংশটি অবিচ্ছিন্ন রেখে তার নিচ থেকে চিরে দু’ভাগ করতে হয়।

এরপর চেরা অংশ বা চটা দু’টো লাউয়ের দু’পাশে শক্ত করে আটকানো হয়। দন্ডের উপরের অংশে গাঁটের ওপরে তার আটকানোর জন্য একটি খুঁটি থাকে। এই খুঁটিতে তার জড়িয়ে বাঁশের চটা দু’টির মধ্য দিয়ে তারটি লাউয়ের খোলের ভেতর দিয়ে চামড়ার নিচ পর্যন্ত টেনে নিয়ে একটি চাকতির সাহায্যে আটকিয়ে দেওয়া হয়। খুঁটি মুচড়ে গানের সুরের সাথে তারের সুর মেলানো হয়।

এরপর ডানহাতের তর্জনীতে মিজরাব লাগিয়ে সেটির সাহায্যে তারে আঘাত করে বাজাতে হয়। একতারার চেয়ে এটি বেশি বৈচিত্রপূর্ণ এই কারণে যে, তারে আঘাত করার পরই বাঁশের চটায় একবার চাপ দেওয়া হয় আবার ছেড়ে দেওয়া হয়। এভাবে তার ও চামড়ার ছাউনির চাপের যে পরিবর্তন হয় তা স্বরের উচ্চ-নিম্নতা সাধন করে। চাপ দিলে তারটি ঢিলে হয় এবং সুর নেমে যায়। আবার ছেড়ে দিলে যে সুরে বাঁধা থাকে সেই সুরে বাজে। ফলে ছন্দময় একটি সুরেলা শব্দ সৃষ্টি হয়।

 

চিত্র – লাউ

সুর মেলানো বা সুর ধরে রাখার যন্ত্রের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে তানপুরা। তানপুরা স্বর বৈভবে অতুলনীয়। এর প্রতিটি তার এমন স্বর-বৈচিত্র সৃষ্টি করে যার কোন তুলনা নাই, এমনকি কোনভাবে বিশ্লেষণ করেও বোঝানো সম্ভব নয়, কিন্তু মাত্র চারটি বা পাঁচটি তার থেকেই পূর্ণ সপ্তকের আবহ সৃষ্টি হয়। এই চারটি তার থেকে সা, পা এবং কখনো এর সাথে রাগের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আরো একটি বা দু’টি সুর উৎপন্ন করা হয়।

এই দু’টি বা তিনটি স্বর একত্রে বেজে উঠলে শুধু দু’টি বা তিনটি স্বর নয়, যেন সাতটি সুরের রেশ একত্রে বেজে ওঠে, ফলে অনেকটা গুঞ্জনের মত মনে হয়। ইংরেজিতে যাকে ‘ড্রোন’ বলে তানপুরার সুর তা থেকেও স্বতন্ত্র। সে কারণে অনেকের মতে তানপুরাকে শুধু ‘ড্রোন’ বললে ঠিক বলা হয় না। কারণ প্রকৃতপক্ষে এর অবদান আরো বেশি। শুধু মূল সুরটা ধরে রাখা নয়, তার চেয়েও বেশি এর কার্যকারিতা।

এটি চক্রাকার প্রবাহের মাধ্যমে সুরের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। সুরের এই ঐশ্বর্যকে পটভূমি হিসেবে রেখে কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করা হয়ে থাকে। তানপুরার গঠন অতি সাধারণ। চামড়ার ছাউনি প্রায় নব্বই সেন্টিমিটার চওড়া বড় লাউয়ের খোল দিয়ে তুম্বা তৈরি হয়। লাউটি উপযুক্ত আকারে কেটে এর খোলা অংশ পাতলা কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। একে তবলী বলো হয়। একটা ছোট্ট কাঠের গলা জুড়ে দেওয়া হয় এবং তার সঙ্গে একটি ডান্ডা সংলগ্ন করা হয়।

ডান্ডাটিকে বলে পটরী। লাউয়ের নিচের অংশে একটি হাড়ের তৈরি লেঙুট আটকানো হয়। তবলীর ঠিক মধ্যখানে কাঠের তৈরি একটা ব্রিজ বা সওয়ারি আঠা দিয়ে লাগানো হয়। চামড়ার ছাউনি তানপুরার উপরের দিকে দু’টো হাড়ের তৈরি তারগহন পটরীর সঙ্গে আঠা দিয়ে যুক্ত করা হয়। তারপরে দন্ডের দু’পাশে এবং পটরীর উপরের অংশে দু’টো ছিদ্র করে কাঠের তৈরি চারটি খুঁটি বা বয়লা লাগানো হয়।

চারটি বয়লা থেকে চারটি তার দু’টি তারগহনের ভিতর দিয়ে তবলীর উপরে অবস্থিত সওয়ারি অতিক্রম করে লেভুটের সাথে সংযোজন করা হয়। গান গাওয়ার সময় মধ্যমা ও তর্জনীর সাহায্যে তারে ক্রমান্বয়ে আঘাত করে শব্দ উৎপন্ন করা হয়। ফলে সুন্দর একটি সুরের রেশ তৈরি হয়। একক বাদ্যযন্ত্র বাজাবার সময় একজন তানপুরা বাদক মূল যন্ত্রসংগীত শিল্পীর সাথে সঙ্গত করে থাকেন।

 

গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

 

পলিকর্ড

তানপুরার মত এটি শুধু সুর ধরে রাখার যন্ত্র নয়। এতে সুর বাজানো যায়, তবে একটি স্বরের জন্য একটি তার রাখতে হয়। ইংরেজিতে হার্প বলতে যে ধরণের যন্ত্র বোঝায় এটি আসলে সেই যন্ত্র। চামড়ার ছাউনি যতগুলো স্বর বাজাতে চাই ততগুলো তার সংযোজন করতে হবে। একটি তার থেকে পৃথক পৃথক সুর বাজানো যাবেনা, যেমন করে সেতার বাজানো হয়। “একটি তার একটি স্বর” এটি হচ্ছে এই জাতীয় যন্ত্রের মূল তত্ত্ব।

এই ধরণের যন্ত্রের সবচেয়ে প্রাচীন উৎস সম্ভবত শিকারীর ধনুক। ধনুকের ছিলার টঙ্কার ধ্বণি আদিম মানুষকে তার সংগীত উপযোগিতা সম্পর্কে কোন ধারণা দিয়ে থাকতে পারে। একটি মাত্র তার হওয়ায় সূচনায় এটি শুধু টানা সুর হিসেবে ব্যবহৃত হবো। একই ধনুকে অনেকগুলো তার যোজনা করে বিভিন্ন স্বর উৎপন্ন হলো এবং সৃষ্টি হলো হার্প।

পাশ্চাত্যে প্রচলিত বিভিন্ন ধরণের হার্প কম-বেশি ধনুকাকৃতির। আমাদের দেশে আধুনিক যুগে পলিকর্ডের উদাহরণ হচ্ছে সম্ভর এবং সুরমন্ডল।

 

চিত্র – পলিকর্ড জাতীয় যন্ত্র : সুরমণ্ডল

মনোকর্ড

এই জাতীয় যন্ত্রে সমগ্র সুর বাজানোর জন্য একটি তারই যথেষ্ট। হয়তো বাদ্যযন্ত্রটিতে একাধিক তার থাকতে পারে, কিন্তু প্রত্যেকটি তার অপরগুলো ছাড়াই স্বতন্ত্রভাবে সুর সৃষ্টি করতে পারে। মনোকর্ড পর্দাযুক্ত বা পর্দাবিহীন হতে পারে, লম্বা গলার বা ছোট গলার হতে পারে, তার টেনে বাজানোর অথবা ধনুযন্ত্র হতে পারে, এবং প্রকৃতিতে তারা অসংখ্য হতে পারে।

প্রত্নতত্ত্বের আবিস্কার বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানতে পেরেছেন যে, এদেশের প্রথম যুগের বীণা ছিলো পলিকর্ড ধরণের। অর্থাৎ একটি তার একটি সুর। পরবর্তীকালে এর বিবর্তন সাধিত হয় এবং ধরণ পরিবর্তিত হয়। চামড়ার ছাউনি ক্রমান্বয়ে প্রাথমিক ধরণের বীণা পরিণত হয় আধুনিক মনোকর্ড যন্ত্রে। যেমন, স্বরস্বতী বীণা কিংবা সেতার।

 

চিত্র – মনোকর্ড জাতীয় যন্ত্র সেতার

বাদ্যযন্ত্রের ইতিহাসের যে সকল প্রামাণ্য পুস্তক বাংলায় রচিত হয়েছে সেখানে যন্ত্রের আকৃতি ও নির্মাণকৌশল নির্বিশেষে অর্থাৎ পলিকর্ড মনোকর্ড নির্বিশেষে সবগুলোকেই বীণা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলায় সবকটিকে বীণা বলা হলেও আকারগত প্রকারভেদ অনুসারে এগুলোকে হার্প (Harp), লিউট (Lute) অথবা জিথার (Zither) ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

ইতিহাসের ক্রমবিবর্তনে দেখা যায় কোন নির্দিষ্ট সময়ের পরিসরে হার্প জাতীয় যন্ত্র, আবার অন্য কোন সময়ে লিউট, কখনো বা জিথার জাতীয় যন্ত্র প্রাধান্য বিস্তার করেছে।

প্রাচীন একতারের তারযন্ত্র কিভাবে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অথবা বলা যায় বার বার রূপ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কিভাবে আধুনিক সেতার, সরোদ বা এস্রাজের পর্যায়ে পৌঁছালো তা বুঝবার জন্য হার্প, লিউট, জিথার ইত্যাদির স্বরূপ জানা অত্যন্ত জরুরী। ইতিহাসের ধারাবাহিকতার সাথে সমন্বয় রেখে এখানে একটি বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা দেওয়া হলো ।

আরও দেখুন :

শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শান্ত্রীয় সঙ্গীত, লোকগান, রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, সেতার, বেহালা, বাঁশি, তবলা, নৃত্য, আবৃত্তি, অভিনয়, চলচ্চিত্র, ফাইন আর্ট

Exit mobile version