শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শিল্পসত্তা মানেই হলো বাংলার মাটি, মানুষ আর তাদের টিকে থাকার আদিম লড়াই। ১৯৭৬ সালে, তাঁর মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে আঁকা ‘সংগ্রাম’ (The Struggle) তৈলচিত্রটি কেবল একটি শিল্পকর্ম নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় এবং মানুষের অপরাজেয় মানসিকতার ইশতেহার। ক্যানভাসে তেলরঙের এই কাজটি জয়নুলের শিল্পজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার এক চূড়ান্ত নির্যাস। ছবিতে একটি বিশালাকার ষাঁড় যখন কাদায় দেবে যাওয়া চাকা উদ্ধারে তার সমস্ত অস্তিত্বকে বাজি রাখে, তখন দর্শক কেবল একটি প্রাণীর কসরত দেখেন না, বরং দেখেন মহাকালের চাকা সচল রাখার এক নিরন্তর মানবিক যুদ্ধ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: মৃত্যুর ছায়ায় জীবনের জয়গান
১৯৭৬ সালটি জয়নুলের জীবনের জন্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং চূড়ান্ত। তিনি তখন ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত। শরীর ভেঙে পড়েছে, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে, কিন্তু তাঁর তুলি তখনও সচল। এই শারীরিক অসুস্থতা আর মৃত্যুচিন্তার মাঝেই তিনি ‘সংগ্রাম’ ছবিটি আঁকেন।
শিল্প ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই ছবিটি জয়নুলের নিজের জীবনেরই এক রূপক। একদিকে জরাজীর্ণ শরীর (যার প্রতিফলন দেখা যায় ষাঁড়টির পাজরের হাড়ে), অন্যদিকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সৃজনশীলতার চাকা টেনে নেওয়ার এক দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা। এছাড়াও, ১৯৭০-এর দশকের সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, পুনর্গঠনের লড়াই এবং সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধের যে বাস্তবতা ছিল, ‘সংগ্রাম’ চিত্রকর্মটি সেই সামগ্রিক পরিস্থিতির এক প্রতীকী দলিল হয়ে ওঠে।
বিষয়বস্তুর প্রাথমিক পরিচয়: দৃশ্যপট বিশ্লেষণ
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি সুঠাম কিন্তু হাড় জজির ষাঁড়। তার কাঁধে জোয়াল, পেছনে কাদায় আটকে পড়া একটি মালবাহী গাড়ি। গাড়ির চাকাটি প্রায় অর্ধেক কাদার গভীরে। গাড়ির ওপর একজন গাড়োয়ান রয়েছে, কিন্তু তার অস্তিত্বকে শিল্পী এখানে প্রায় আড়াল করে দিয়েছেন। মূল আলো এবং মনোযোগ নিবদ্ধ হয়েছে ষাঁড়টির ওপর।
পশুটি তার ঘাড় নিচু করে, মেরুদণ্ড ধনুকের মতো বাঁকিয়ে এমন এক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, যা থেকে বোঝা যায় সে তার শরীরের শেষ বিন্দু শক্তি দিয়ে চাকাটি টেনে তোলার চেষ্টা করছে। এই দৃশ্যটি গ্রামবাংলার একটি অতি সাধারণ দৃশ্য হলেও জয়নুলের তুলিতে তা ‘আইকনিক’ বা কালজয়ী একটি রূপে উত্তীর্ণ হয়েছে।
শৈল্পিক ও কারিগরি বিশ্লেষণ (The Aesthetics and Craftsmanship)
৩০০০ শব্দের এই বিশাল ক্যানভাসে ছবিটির দ্বিতীয় ধাপে আমরা আলোচনা করব জয়নুল আবেদিনের সেই অসামান্য নির্মাণকৌশল বা ‘ক্রাফটম্যানশিপ’ নিয়ে, যা ছবিটিকে একটি সাধারণ ড্রয়িং থেকে বিশ্বমানের মাস্টারপিসে পরিণত করেছে।
রেখার জাদুকরী ও সংবেদনশীলতা (Sensitivity of Lines)
জয়নুল আবেদিনকে ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে ‘রেখার জাদুকর’ বলা হয়। তাঁর ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলোতে আমরা যে বলিষ্ঠ রেখার ব্যবহার দেখেছিলাম, ‘সংগ্রাম’ চিত্রে তা এক অন্য মাত্রায় পৌঁছেছে।
এখানে রেখা কেবল বস্তুর সীমানা নির্ধারণ করে না, বরং রেখা নিজেই এখানে ‘আবেগ’ হিসেবে কাজ করে। ষাঁড়টির অবয়ব আঁকতে তিনি যে দীর্ঘ এবং কৌণিক রেখা ব্যবহার করেছেন, তা দর্শককে এক ধরণের অস্বস্তি দেয়—যা সংগ্রামেরই প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি রেখা এখানে যেন টানটান হয়ে থাকা একেকটি তার, যা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই বলিষ্ঠ রেখাই ছবিটিকে একটি শক্তিশালী ‘স্ট্রাকচার’ দান করেছে।
রুক্ষ ব্রাশ স্ট্রোক ও টেক্সচারের ভাষা (The Bold Brushwork)
শিল্পী জয়নুল এই তৈলচিত্রটিতে অত্যন্ত রুক্ষ এবং বলিষ্ঠ ব্রাশ স্ট্রোক ব্যবহার করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন ক্যানভাসের ওপর রঙের এক ধরণের রুক্ষতা বজায় রাখতে। কেন? কারণ ‘সংগ্রাম’ কোনো নরম বা মোলায়েম অনুভূতির বিষয় নয়। কাদার আঠালো ভাব, পশুর গায়ের ঘাম আর ধুলোবালির সেই রুক্ষতাকে ফুটিয়ে তুলতে তিনি তুলির আঁচড়গুলোকে একে অপরের ওপর লেপে দিয়েছেন।
ব্রাশের এই ‘রাফনেস’ বা অমসৃণতা প্রমাণ করে যে, শিল্পী ছবিটিকে কেবল সুন্দর করতে চাননি, বরং ছবির ভেতরকার যন্ত্রণাকে স্পর্শযোগ্য (Tactile) করতে চেয়েছেন। ব্রাশ স্ট্রোকগুলো এখানে গতিশীল; মনে হয় যেন শিল্পীর হাত ক্যানভাসের ওপর দিয়ে সংগ্রামের সেই তীব্রতাকেই ধাওয়া করছিল।
নেগেটিভ স্পেস ও কম্পোজিশনের ভারসাম্য (Negative Space and Composition)
একজন বিজ্ঞ শিল্পরসিক লক্ষ্য করবেন, এই ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড বা পটভূমি অত্যন্ত সাধারণ এবং প্রায় শূন্য। একেই বলা হয় নেগেটিভ স্পেসের সার্থক ব্যবহার। জয়নুল এখানে কোনো গাছপালা, মেঘ বা সুন্দর দৃশ্য দিয়ে দর্শককে বিভ্রান্ত করতে চাননি।
ছবির পুরো মনোযোগ যাতে কেবল সেই ‘সংগ্রাম’রত ষাঁড় আর কাদার চাকায় নিবদ্ধ থাকে, সেজন্য তিনি ব্যাকগ্রাউন্ডকে প্রায় একরঙা ও নিস্পৃহ রেখেছেন। এর ফলে ছবির মূল বিষয়বস্তু বা ‘সাবজেক্ট’ এক ধরণের ভাস্কর্যসুলভ মর্যাদা (Statuesque Quality) পায়। ছবির গঠনশৈলী বা কম্পোজিশনটি একটি তির্যক (Diagonal) রেখায় বিন্যস্ত, যা স্থবিরতার বিপরীতে গতিশীলতা এবং প্রবল চাপের এক চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করে।
রঙের পরিমিতিবোধ ও ‘আর্থি টোন’ (Color Palette and Earthy Tones)
রঙের ক্ষেত্রে জয়নুল আবেদিন এখানে চরম সংযম দেখিয়েছেন। পুরো চিত্রকর্মটি মূলত ব্রাউন (Brown), মেটে (Ochre), এবং ছাই রঙের (Greyish tone) বিভিন্ন শেডে মোড়া। এই রঙগুলো আমাদের মাটির কথা মনে করিয়ে দেয়।
রঙের এই সীমাবদ্ধতা ছবিটিকে একটি ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল গাম্ভীর্য দিয়েছে। তিনি উজ্জ্বল রঙের ছটা এড়িয়ে গিয়ে বেছে নিয়েছেন ‘আর্থি টোন’, যা একদিকে যেমন বাংলার কাদা-জলের বাস্তবতাকে তুলে ধরে, অন্যদিকে সংগ্রামের রুক্ষতাকে গম্ভীর করে তোলে। ডার্ক শেড বা কালচে রঙের ব্যবহার পশুর শরীরের ছায়া ও পেশির গভীরতাকে আরও রহস্যময় ও শক্তিশালী করেছে।
আলোর প্রক্ষেপণ (Play of Light and Shadow)
ছবির আলো কোনো নির্দিষ্ট উৎস থেকে আসছে বলে মনে হয় না, বরং মনে হয় আলোটি পশুর শরীরের উপরিভাগে বা উঁচিয়ে থাকা হাড়ের ওপর আছড়ে পড়ছে। এই চ্যারোস্কুরো (Chiaroscuro) বা আলো-ছায়ার দ্বন্দ্বই ছবিটির থ্রি-ডি ইফেক্ট বা ত্রিমাত্রিকতা তৈরি করেছে। আলোর এই প্রয়োগই বুঝিয়ে দেয় ঠিক কোথায় সবচেয়ে বেশি শক্তি খরচ হচ্ছে—যেমন ষাঁড়টির ঘাড় আর কুঁজের ওপর।
অ্যানাটমি ও বলবিজ্ঞান (Anatomy and Mechanics of Struggle)
৩০০০ শব্দের এই সমালোচনামূলক প্রবন্ধের এই অংশটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আমরা দেখব কীভাবে জয়নুল আবেদিন জীববিদ্যা (Biology) এবং পদার্থবিদ্যাকে (Physics) একবিন্দুতে মিলিয়েছেন। একজন শিল্পরসিকের কাছে এই অংশটিই ছবির ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’।
পেশির সংকোচন ও প্রসারণ (Extreme Contraction)
ছবির দিকে তাকালে আপনি প্রথম যে জিনিসটি অনুভব করবেন, তা হলো এক তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা। একটু যদি অ্যানাটমি বোঝেন, তবে দেখবেন—শিল্পী এখানে ষাঁড়টির পেশির ওপর এক চরম চাপ বা Extreme Contraction দেখিয়েছেন। ষাঁড়টির ঘাড়ের কাছের পেশিগুলো প্রচণ্ডভাবে ফুলে আছে, কারণ সেখানেই জোয়ালের সমস্ত ওজন আছড়ে পড়ছে। পেছনের পা দুটি টানটান হয়ে প্রসারিত, যা নির্দেশ করে যে পশুটি তার শরীরের শেষ বিন্দু শক্তি দিয়ে মাটি আঁকড়ে ধরছে। এই যে পেশির সংকোচন-প্রসারণের খেলা, এটি দর্শককে এক ধরণের ‘এমপ্যাথি’ বা সমব্যথা দেয়; মনে হয় যেন আমরা নিজেই সেই ভারটা টানছি।
হাড়ের প্রক্ষেপণ ও ‘এক্স-রে ভিশন’ (Skeletal Prominence)
জয়নুল আবেদিন এখানে ষাঁড়টিকে সুঠাম কিন্তু শীর্ণ দেখিয়েছেন। পশুর চামড়ার ওপর দিয়ে তার পাঁজরের হাড়গুলো (Ribs) স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। অ্যানাটমির এই ডিটেইল কেবল পশুর দুর্বলতা বোঝায় না, বরং এটি যন্ত্রণার চূড়ান্ত মুহূর্তে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার এক করুণ চেষ্টা। শিল্পী যখন হাড়ের এই খাঁচাটিকে দৃশ্যমান করেন, তখন তা লড়াইয়ের রুক্ষতাকে আরও নগ্ন করে তোলে। একে অনেক সময় ‘X-ray Vision’ বলা হয়, যেখানে শিল্পী বস্তুর বাইরের আবরণ ছাপিয়ে তার ভেতরের হাহাকারকে ফুটিয়ে তোলেন।
মেরুদণ্ডের আর্ক ও বলবিজ্ঞান (The Mechanics of Arc)
সবচেয়ে চমকপ্রদ হলো ষাঁড়টির মেরুদণ্ডের গঠন। লক্ষ্য করলে দেখবেন, মেরুদণ্ডটি সোজা নয়, বরং একটি নিখুঁত ধনুকের মতো বাঁকানো (Arc)। পদার্থবিজ্ঞানের বলবিদ্যা (Mechanics) অনুযায়ী, কোনো ভারী বস্তু টানার সময় এই ধনুকাকৃতি বা আর্চ ফর্মই সবচেয়ে বেশি চাপ বা ‘Stress’ সহ্য করতে পারে। জয়নুল হয়তো কোনো ল্যাবরেটরিতে বসে পদার্থবিদ্যা পড়েননি, কিন্তু মাটির মানুষের লড়াকু জীবন দেখতে দেখতে তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন যে—লড়াইয়ের সময় মেরুদণ্ড ধনুক হয়ে যায়। শিল্পী এখানে অ্যানাটমিকে যেন মেকানিক্সের সাথে একীভূত করে দিয়েছেন।
ভারকেন্দ্র বা সেন্ট্রাল অব গ্রাভিটি (Center of Gravity)
একজন ইঞ্জিনিয়ারের দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, জয়নুল ষাঁড়টির পা ফেলার ভঙ্গিতে নিখুঁত ভারসাম্য রেখেছেন। সামনের পা দুটি কাদার মধ্যে দেবে গেছে আর পেছনের পা দুটি অনেক পেছনে প্রসারিত। এর ফলে পশুর শরীরের ভারকেন্দ্র বা Center of Gravity মাটির একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। যখন কোনো বস্তুর ভারকেন্দ্র মাটির কাছে থাকে, তখন সেটি সবচেয়ে বেশি স্থিরতা (Stability) পায়। এই নিচু হয়ে থাকা ভঙ্গিটিই প্রমাণ করে যে পশুটি কোনো সাধারণ হাঁটা দিচ্ছে না, বরং সে একটি অনড় পাহাড়কে নাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এস্থেটিক ডিস্টোরশন বা নান্দনিক বিকৃতি
একজন বিশেষজ্ঞ লক্ষ্য করবেন, জয়নুল এখানে হুবহু অ্যানাটমি অনুসরণ করেননি। তিনি ব্যবহার করেছেন ‘এস্থেটিক ডিস্টোরশন’। ষাঁড়ের ঘাড় এবং পেছনের অংশের অনুপাত শিল্পী কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাস্তবে কোনো ষাঁড় হয়তো এতটা বাঁকতে পারে না, কিন্তু এই লড়াইয়ের ভয়াবহতা বা অতিমানবীয় বিশালত্ব (Magnanimity) বোঝাতে শিল্পীকে বাস্তবের ব্যাকরণ কিছুটা ভাঙতে হয়েছে। সত্যকে আরও বড় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই এই শৈল্পিক বিকৃতি।
দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক সমালোচনা (Philosophical and Sociological Critique)
৩০০০ শব্দের এই মহাকাব্যিক প্রবন্ধের এই স্তরে আমরা ছবির ক্যানভাস ছাড়িয়ে এর গভীরে থাকা জীবনদর্শন এবং সামাজিক বার্তার দিকে নজর দেব। জয়নুলের ‘সংগ্রাম’ কেবল একটি ঘামঝরানো দৃশ্য নয়, এটি মানুষের অস্তিত্বের এক গভীর রূপক।
মানুষ ও পশুর একীভূত সত্তা (Oneness of Struggle)
ছবির দিকে তাকালে আপনি দেখবেন, মানুষ (গাড়োয়ান) এবং পশু (ষাঁড়)—উভয়েই একাকার হয়ে গেছে। যদিও শিল্পী গাড়োয়ানকে কিছুটা আবছা রেখেছেন, কিন্তু জোয়ালের একপ্রান্ত যখন পশুর কাঁধে, অন্যপ্রান্ত তখন মানুষের জীবিকার সাথে যুক্ত। জয়নুল এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, তৃতীয় বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের জীবন আর এই পশুর জীবন সমান্তরাল। দুজনেরই লক্ষ্য এক—টিকে থাকা। এই সহাবস্থান দর্শায় যে, ক্ষুধার রাজ্যে মানুষ এবং প্রকৃতির লড়াই আলাদা কিছু নয়; তারা একে অপরের পরিপূরক।
চাকা: মহাকালের এক অনড় প্রতীক
ছবির সেই কাদায় আটকে পড়া চাকাটি কেবল একটি কাঠের চাকা নয়। এটি স্থবিরতা এবং প্রতিকূলতার প্রতীক। চাকাটি যখন কাদার ভেতরে অর্ধেক ঢুকে আছে, তখন সেটি সমাজের সেইসব বাধা বা শোষণকে নির্দেশ করে যা অগ্রগতিকে রুখে দেয়। ষাঁড়টির সেই চাকা টেনে তোলার চেষ্টা আসলে মহাকালের চাকা (Wheel of History) সচল রাখার এক নিরন্তর প্রয়াস। চাকাটি অনড় থাকা মানে সভ্যতা থমকে যাওয়া, আর তাকে সচল করা মানে হলো জীবনের জয়গান।
নগ্ন বাস্তবতা বনাম সৌন্দর্যতত্ত্ব (Realism vs. Aesthetics)
জয়নুল আবেদিন তথাকথিত ‘শোভন’ বা ‘সুন্দর’ আর্টে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন সেই সৌন্দর্যে যা সত্যের ভেতর দিয়ে আসে। এই ছবিতে ষাঁড়টির জীর্ণ শরীর, হাড়ের খাঁচা আর কাদার মাখামাখি অবস্থা দেখে কেউ একে ‘কুৎসিত’ বলতে পারেন। কিন্তু একজন শিল্পরসিকের কাছে এই নগ্ন বাস্তবতাই (Raw Realism) পরম সুন্দর। জীবনের চরম সংকটেও যে হাল না ছাড়ার জেদ, সেই জেদের ভেতরেই জয়নুল এক অদ্ভুত আভিজাত্য বা ‘ডিগনিটি’ খুঁজে পেয়েছেন।
রাজনৈতিক রূপক: এক সদ্য স্বাধীন জাতির লড়াই
১৯৭৬ সালের প্রেক্ষাপটে এই ছবিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ তখন মাত্র কয়েক বছর হলো স্বাধীন হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের যে বিশাল দায়ভার, তা ছিল এই কাদার চাকায় আটকে পড়া দেশের মতোই। জয়নুল হয়তো এই ষাঁড়টির মাধ্যমে বাঙালির সেই অপরাজেয় মানসিকতাকেই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন—যে জাতি শত শোষণ আর কাদা মাড়িয়েও সামনে এগিয়ে যেতে জানে। এটি একটি জাতির সম্মিলিত প্রতিরোধের (Collective Resistance) এক নিঃশব্দ চিৎকার।
শিল্পীর ব্যক্তিগত সংগ্রাম (Personal Philosophy)
মৃত্যুপথযাত্রী জয়নুল যখন এই ছবিতে তুলি ছোঁয়াচ্ছেন, তখন তিনি জানতেন তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে। ক্যানভাসের এই লড়াইটি আসলে শিল্পীর নিজের জীবনের লড়াই। ক্যান্সারের মরণব্যাধি যখন তাঁর শরীরকে কুরে কুরে খাচ্ছে, তখন তিনি নিজেকে সেই ষাঁড়টির জায়গায় কল্পনা করেছেন। শরীরের শেষ বিন্দু রক্ত দিয়ে শিল্পসৃষ্টির চাকা টেনে নিয়ে যাওয়ার এই যে আকুলতা, তা এই ছবিকে জয়নুলের ‘শিল্পী-ইশতেহার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বিশ্বশিল্পের প্রেক্ষাপট ও উপসংহার (Global Context and Conclusion)
৩০০০ শব্দের এই দীর্ঘ সমালোচনামূলক প্রবন্ধের সমাপনী অংশে আমরা দেখব কীভাবে জয়নুল আবেদিনের এই দেশীয় প্রেক্ষাপটে আঁকা ছবিটি বিশ্বজনীন হয়ে উঠল এবং আধুনিক শিল্পকলার ইতিহাসে এর স্থান কোথায়।
বিশ্বশিল্পের ধারায় জয়নুলের ‘সংগ্রাম’
জয়নুল আবেদিনের এই শিল্পকর্মটি ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদের সাথে বাংলার মাটির এক অনন্য সেতুবন্ধন। শিল্পরসিকরা অনেক সময় এই ছবিটির বলিষ্ঠতার সাথে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের রুক্ষ ব্রাশ স্ট্রোক কিংবা জার্মান এক্সপ্রেশনিস্টদের (Expressionists) যন্ত্রণাময় অবয়বের তুলনা করেন। কিন্তু জয়নুল এখানে কাউকে অনুকরণ করেননি। যেখানে পশ্চিমা শিল্পীরা অনেক সময় বিমূর্ততার (Abstraction) আড়ালে মানুষের হাহাকার লুকিয়ে ফেলেন, জয়নুল সেখানে মূর্ত বাস্তবতাকে (Representational Art) বজায় রেখেই লড়াইয়ের এক বিমূর্ত শক্তিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই ছবিটির কারিগরি দক্ষতা একে বিশ্বমানের ‘মাস্টারপিস’-এর মর্যাদা দেয়।
উপমহাদেশের আধুনিক শিল্পকলায় স্থান
উপমহাদেশের চিত্রকলায় এক সময় যখন কেবল মিথোলজি বা রোমান্টিক দৃশ্য আঁকার চল ছিল, জয়নুল তখন সাধারণ কাদা-মাটি আর পশুর কষ্টকে শিল্পের মূল উপজীব্য করে তোলেন। ‘সংগ্রাম’ ছবিটি প্রমাণ করে যে, অতি সাধারণ একটি বিষয়ের মধ্যেও মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি লুকিয়ে থাকতে পারে। এটি আধুনিক ভারতীয় ও বাংলাদেশি শিল্পীদের শিখিয়েছে কীভাবে নিজস্ব ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বজনীন ভাষায় কথা বলতে হয়।
জীবনের শেষ সুর (Swan Song)
১৯৭৬ সালে আঁকা এই ছবিটি ছিল শিল্পাচার্যের এক ধরণের ‘সোয়ান সং’ বা শেষ বিদায়ী গান। তিনি সারা জীবন যে ‘ম্যান এগেইনস্ট নেচার’ বা ‘ম্যান এগেইনস্ট ডেসটিনি’ (ভাগ্য বা প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই) এঁকেছেন, এই ছবিটি তার চূড়ান্ত পরিণতি। শিল্পী তাঁর জীবদ্দশায় বারবার দেখেছেন দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা আর রাজনৈতিক বিপর্যয়। এই প্রতিটি অভিজ্ঞতাই যেন দানা বেঁধে এই ছবির ষাঁড়টির পেশিতে জমা হয়েছে।
মহাকালের চাকা ও পাঠকের উত্তরাধিকার
এই ছবিটির সামনে দাঁড়ালে যে কেউ অনুভব করবেন যে, লড়াইটি কেবল ক্যানভাসের সেই ষাঁড়টির নয়—ল লড়াইটি আমাদের সবার। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন এক একটি ‘কাদাভর্তি চাকা’ আছে, যা আমরা টেনে তুলবার চেষ্টা করছি। জয়নুল আবেদিন আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, চাকা উঠবে কি উঠবে না, তার চেয়েও বড় কথা হলো—সমস্ত শক্তি দিয়ে চাকাটি টানার সেই অদম্য প্রচেষ্টা। সেই প্রচেষ্টাই একজন মানুষের বা একটি জাতির প্রকৃত আভিজাত্য।
অমরত্বের নাম ‘সংগ্রাম’
পরিশেষে বলা যায়, জয়নুল আবেদিনের ‘সংগ্রাম’ কেবল একটি অয়েল পেইন্টিং নয়; এটি মানুষের অপরাজিত আত্মার এক কালজয়ী মহাকাব্য। যে রেখা, যে রঙ আর যে অ্যানাটমি তিনি এই ছবিতে ব্যবহার করেছেন, তা যুগ যুগ ধরে শিল্পের শিক্ষার্থী আর রসিকদের অনুপ্রেরণা জোগাবে। যতক্ষণ পৃথিবীতে প্রতিবন্ধকতা থাকবে এবং যতক্ষণ মানুষ সেই বাধা পেরিয়ে সামনে এগুতে চাইবে, ততক্ষণ এই ‘সংগ্রাম’ চিত্রকর্মটি প্রাসঙ্গিক থাকবে। এটি কেবল জয়নুলের শ্রেষ্ঠ কাজ নয়, এটি বাঙালির শ্রেষ্ঠ সম্পদ এবং বিশ্বমানবতার এক অবিনাশী দলিল।