রবীন্দ্র নৃত্যের বৈশিষ্ট্য ও প্রাচীন নৃত্যের তুলনা

আজকের আমাদের আলোচনার বিষয় রবীন্দ্র নৃত্যের বৈশিষ্ট্য ও প্রাচীন নৃত্যের তুলনা

রবীন্দ্র নৃত্যের বৈশিষ্ট্য ও প্রাচীন নৃত্যের তুলনা

 

নৃত্যনাট্য উদ্ভবের প্রাচীন কথা

 

রবীন্দ্র নৃত্যের বৈশিষ্ট্য

এখন রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত নৃত্য বা গান্তিনিকেতনী নৃত্যের বৈশিষ্ট্য কি, দেখা যাক। রবীন্দ্রনৃত্যের স্বরূপ বিশ্লেষণ করলে নিবলিখিত কয়টি উপাদান পাওয়া যায়-

(ক) নৃত্য সর্বাঙ্গসুন্দর অভিনয়ের উৎকৃষ্ট অঙ্গ।

(খ) কবি রচিত সাহিত্য বা কাব্যই এই নৃত্যের মূল বিষয়বস্তু ।

(গ) এই কাব্য রচনার সাথে সূরযোজনা করায় প্রকৃত সংগীতের সৃষ্টি। এই সংগীতই রবীন্দ্রনাট্যের মূলভিত্তি।

(ঘ) সেই সংগীতের অন্তনির্হিত ভাবকে নাদের অভিনয় দ্বারা দেহচ্ছন্দে ব্যঞ্জিত করে দর্শকের চিত্তে অনির্বচনীয় রসের উদ্বোধন।

প্রাচীন নৃত্যের তুলনা

ক) নৃত্য মূলত ভারতীয় আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। অভিনয়দর্পণ’-এ বলা আছে, সংগীতের ভাবকে নৃত্যের তাল ও মুদ্রাদির কায়িক অভিনয়ের দ্বারা দর্শক মনে সঞ্চারিত করে রসের উদ্রেক করতে হবে। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যও অনেকটা তাই। এই নৃত্য গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ গানের উপর নির্ভর করে। গীতাভিনয়ের পরিপূর্ণতা নৃত্যাভিনয় ।

 

রবীন্দ্র নৃত্যের বৈশিষ্ট্য ও প্রাচীন নৃত্যের তুলনা

 

কিন্তু প্রাচীন পদ্ধতিকে কবি হুবহু গ্রহণ করেন নি, মূলত ঐ পদ্ধতির উপরেই তার নবসৃষ্টি নতুন রূপ ধরে আধুনিক কালের রসপিপাসা চরিতার্থ করেছে।

খ) প্রাচীন ভারতীয় নৃত্যে মুদ্রার ছিল একান্ত প্রাধান্য। প্রথমে মুদ্রা প্রদর্শন, তারপর নৃত্য। কিন্তু ঐ প্রাচীন মুদ্রার অর্থ বর্তমান যুগে সাধারণের নিকট সহজবোধ্য নয়, দুর্বোধ্য মুদ্রাভিনয় ব্যাঙ্গাভিনয়ে পরিণত হতে পারে। তাই তিনি মুদ্রাকে যথাসম্ভব ত্যাগ করেছেন।

পূর্বে বলা হয়েছে দক্ষিণী নৃত্যের মধ্যে প্রাচীন ভারতীয় নৃত্যের রূপ অনেকটা অবিকৃত আছে। বর্তমান কথাকলি নৃত্যে মুদ্রার বিশেষ প্রাধান্য রয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার নৃত্যনাট্যে-বিশেষ করে ‘চণ্ডালিকা য় কথাকলির আঙ্গিক অর্থাৎ ভঙ্গিমা ও তাল গ্রাহণ করলেও তার মুদ্রা অংশটি গ্রহণ করেননি।

গ) প্রাচীন নৃত্যে সংগীতের খুব একটা নিজস্ব পরিপূর্ণতা ছিল না; খন্ড খন্ড গানের সঙ্গে নৃত্য হত, এই ছিল প্রথা। বাদ্যের তালের উপর অনেকটা নির্ভর করেই সংগীতযুক্ত নৃত্য তার পূর্ণরূপটি প্রকাশ করত। কিন্তু রবীন্দ্রনৃত্যে সংগীতই হইল মূলভিত্তি, যার উপর নির্ভর করে সমস্ত নৃত্য প্রযোজনা গড়ে উঠছে।

গানের কথা অনুসরণ করে সাহানা, ভৈরবী, বাগেশ্রী, পরজ, বাউল, কীর্তন প্রভৃতি বহু বিচিত্র সুরের ধারা বয়ে চলেছে, এই সব ধারা-সম্মিলনে নৃত্যনাট্য একটা বিরাট সুরের রূপ ধারণ করেছে। এর সহিত নানাবিধ তালের নৃত্য মিলিত হয়ে কথার ভাব-ব্যঞ্জনাকে আরও ফুটিয়ে তুলছে। সংগীত ও নৃত্য চলছে পাশাপাশি; একে অন্যের প্রকাশকে রূদ্ধ করে না। এই সুরের মধ্যে ও তালের মধ্যেও নানা সংমিশ্রণ আছে।

 

রবীন্দ্র নৃত্যের বৈশিষ্ট্য ও প্রাচীন নৃত্যের তুলনা

 

মিশ্র সুর ও মিশ্র ভাল ও ভঙ্গীর সহযোগে রবীন্দ্রনৃত্য গড়ে উঠছে। এর কোনো বিশেষ নৃত্যপদ্ধতিকে আগাগোড়া অনুসরণ করেনি। মণিপুরী, কথাকলি, কথক, ভরতনাট্যম, লোকনৃত্য, ইউরোপীয় নৃত্য প্রভৃতির ভঙ্গী ও তাল কবি যেখানে যতটুকু প্রয়োজন মনে করেছেন ততটুকুই গ্রহণ করেছিলেন এই নানা মিশ্রণের দ্বারা তাঁর ভাবকল্পনুযায়ী এক অভিনব নৃত্যপদ্ধতি গড়ে উঠেছে ।

আরও দেখুন :

Leave a Comment